‘সম্মানরক্ষা’ এই সমাজে যেনো এক মহামারীর আকার ধারণ করেছে। ভারতের উত্তরপ্রদেশে ‘সম্মান রক্ষা’ র নামে ঘটেছে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ জেলার কান্টি গ্রামে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তার নিজের মা-বাবা মেরে ফেলেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।
ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, মৃত কিশোরীর নাম সারিতা। গত ৫নভেম্বর রাতে তাকে হত্যা করা হয়। পরদিন সকালে স্থানীয়রা গ্রামের পাশের ঝোপের মধ্যে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেয়।
যমুনানগর এলাকার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) বিবেক যাদব বলেন, তাঁরা তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছেন এটি একটি ‘অনার কিলিং’ বা সম্মানরক্ষায় হত্যার ঘটনা।
তদন্তের সময় সারিতার বাবা রমেশ পুলিশকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সারিতার বাবা রমেশ পুলিশের কাছে স্বীকার করেন মেয়েকে তিনি নিজেই হত্যা করেছেন।
পুলিশের কাছে রমেশ জানিয়েছেন, তার মেয়ে গ্রামের বেশ কয়েকজন ছেলের যোগাযোগ রাখত। ছেলেদের সাথে কথা বলা নিয়ে সারিতার বাবা অনেক ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি নিষেধ করা সত্ত্বেও সে যোগাযোগ বন্ধ করেনি।
রমেশ পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিতে আরও জানিয়েছে, গত ৫ নভেম্বর সারিতার মা তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করেন। এরপর বাবা-মা দুজনে মিলে তাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৭০/৮০ মিটার দূরের ঝোপে নিয়ে যায়। সেখানেই রমেশ ধারালো অস্ত্র দিয়ে মেয়ের গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করেছে। সারিতার বাবা-মাকে গ্রেপ্তার করে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিসিপি বিবেক যাদব এই হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বলেন, এটি নিছকই একটি সম্মানরক্ষায় হত্যা। মেয়ের স্বাধীন যোগাযোগে পারিবারিক লজ্জার ভয়ে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

অনার কিলিং কী?
অনার কিলিং বা শেইম কিলিং হলো পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে অবাধ্য সদস্যের প্রাণনাশ করার প্রক্রিয়া। অপরাধী ব্যক্তি পরিবারের জন্য অসম্মান বা লজ্জা বয়ে আনলে কিংবা তেমন কোনো সম্ভাবনা থাকলে, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নিয়ম-নীতি অস্বীকার বা অমান্য করলে, বাবা-মায়ের পছন্দ করা পাত্র/পাত্রীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে অস্বীকৃতি জানালে, পরিবারের অপছন্দের কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে কিংবা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে আবদ্ধ হলে, ধর্ষণের শিকার হলে, ধর্মীয় রীতিনীতি মোতাবেক পোশাক পরিধান না করলে কিংবা সমকামিতায় আসক্ত হলে সে অনার কিলিংয়ের শিকার হতে পারে।
‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ‘অনার কিলিং’কে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে- ‘পরিবারের জন্য অসম্মানজনক সন্দেহে পুরুষ সদস্য কর্তৃক অপরাধী নারী সদস্যকে হত্যা বা তার প্রতি সহিংস আচরণের নাম অনার কিলিং। বিভিন্ন কারণে নারী সদস্যটি এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে, যার মধ্যে স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জানানো থেকে শুরু করে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনও কারণ হতে পারে। মোটা দাগে বলা হয়, নারী যখন নিজের জীবনের লাগাম নিজের হাতে তুলে নিতে চায় তখনই গোটা সম্প্রদায় তার বিরুদ্ধে চলে যায়। আর সেই নারীকে চরম শিক্ষা দিয়ে বাকি মেয়েদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পরিবার তুলে নেয় তার প্রাণনিধনের দায়িত্ব।’
পতাকানিউজ/কেএ

