বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭৮ ও ১৯৯১–৯২ সালের দুই দফার পর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আসে সবচেয়ে বড় ঢেউ। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় লাখো রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে অস্থায়ী আশ্রয় দিলেও ক্যাম্পের জনসংখ্যার চাপ কমাতে পরবর্তী সময়ে তাদের একটি অংশকে নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত হাতিয়া উপজেলার প্রতিষ্ঠাকালদ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তর করে সরকার।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৭৩১ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়েছিল। তবে সীমিত সুযোগ-সুবিধা, জীবনযাত্রার সংকট এবং যোগাযোগব্যবস্থার চ্যালেঞ্জের কারণে প্রায় ৭ হাজার রোহিঙ্গা সেখান থেকে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা।
সরকার এখন আর নতুন কাউকে ভাসানচরে পাঠাচ্ছে না, তবে যাঁরা সেখানে আছেন, তাঁদের জন্য প্রকল্প কার্যক্রম চালু আছে। এক্ষেত্রে তাদের থানা পুলিশের নিরাপত্তার বাইরে আরও ৩ স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। সেখানে যথারীতি পুলিশের বিশেষ শাখা এপিবিএন, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও আছেন। তবে প্রশ্ন এখন এত নিরাপত্তা ভেদ করে তারা পালায় কিভাবে?
সেখানকার নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোহিঙ্গারা সেখান থেকে পালানোর প্রবণতা বেড়েছে। তারা সেখান থেকে পালায় বেশ কিছু চক্রের মাধ্যমে। এই চক্রের সাথে চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপেরও বেশ কিছু মানুষের সম্পৃক্ততা আছে। তা ছাড়া ভাটার সময় ভাসান চর থেকে সন্দ্বীপ হেঁটেও যেতে পারে তারা। কারণ ওই স্থানে বেশি পানি থাকে না।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারা মূলত অপরাধের উদ্দেশ্যে বের হয় না। তারা বের হয় মূলত তাদের অন্যান্য আত্নীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে। তাদের অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য হলো কিছু আয় রোজগার করা। রোহিঙ্গাদের খাদ্য নিরাপত্তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকার কাজ করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করে। এর বাইরেও তাদের কিছু চাহিদা থাকে জামা-কাপড়, অন্যান্য জিনিস। সেক্ষেত্রে তাদের এখানে তো কোনো কর্মসংস্থান নেই। তাই তারা কিছু অর্থের লোভে এখান থেকে পালায়। তবে এদের অধিকাংশ আবার ফেরত আসে।
রাতের অন্ধকারে কর্ণফুলী রুট, চট্টগ্রামমুখী নৌকা
স্থানীয় পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ভাসানচর থেকে পালানোর প্রবণতা বেড়েছে। জোয়ারের সময় রাতের অন্ধকারে ছোট নৌকা সমুদ্রে ছাড়ে, নেভানো লাইটে কর্ণফুলী চ্যানেলে ঢুকে পড়ে। এরপর বাকলিয়া, খেতচর, শাহ আমানত সেতু, বাস্তহারা এলাকার বিভিন্ন ঘাটে একদল স্থানীয় চক্র রোহিঙ্গাদের তুলে দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন রহমান। তিনি বলেন, রাতে ছোট নৌকা ঘাটে আসে। মাঝিরা বলে মাছ বা কাঁকড়া ধরতে এসেছে। কিন্তু নৌকা থেকে নামা নতুন মুখগুলো রোহিঙ্গা এটা যে কেউ বুঝবে। খেতচরের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, রাতে অচেনা তরুণদের ঘোরাফেরা বাড়ছে এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় লোকজন মুখ খুলতে ভয় পায়।
নৌকার মাঝি, স্থানীয় দালাল পালানোর মূল সেতুবন্ধন
রোহিঙ্গাদের পাচারের পেছনে মোহাম্মদ কবির (মাছ কবির), কালু মাঝি ও ভোলার শাহীন মাঝি–কে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। মাছ ধরা বা কাঁকড়া ধরার আড়ালে তারা রোহিঙ্গা পরিবহণে জড়িত বলে অভিযোগ। মাছ কবির নিজেও রোহিঙ্গা, ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে এসে কক্সবাজার ক্যাম্পে ওঠেন, পরে ২০০৮ সালের দিকে পরিচয়পত্র জোগাড় করে স্থানীয় চক্রের সহায়তায় রোহিঙ্গা পাচারের সঙ্গে যুক্ত হন বলে দাবি স্থানীয়দের।
সদরঘাট নৌ থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, চক্রটির বিষয়ে আমরা জানি। তদন্ত চলছে। কর্ণফুলী নদী ব্যবহার করে কোনো পাচার কার্যক্রম চলতে দেয়া হবে না।
কাজের সন্ধানে শহরে, কিন্তু
চট্টগ্রামে আটক হওয়া বেশ কয়েকজন তরুণ- নুর সালাম, মোহাম্মদ সালাম, রুবেল, আবুল হাসেম ও কামাল হোসেন জানান, ভাসানচরে কাজ নেই। ভেবেছিলাম শহরে এসে কিছু করব, কিন্তু এখানে এসেও কাজ পাই না। তাঁরা সবাই কবির মাঝির মধ্যস্থতায় চট্টগ্রামে আসার কথা স্বীকার করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৭৬–১৯১ জন রোহিঙ্গার ভাসানচর থেকে পালানোর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আটকের পর গুরুতর অপরাধে সংশ্লিষ্ট না থাকলে তাঁদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।
অসাধু চক্রের তৎপরতা
দীর্ঘায়িত পুনর্বাসন, কাজ ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা অনেক রোহিঙ্গাকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কম মজুরিতে কাজ করানোর জন্য অসাধু স্থানীয়রা আগ্রহী থাকে। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক চোরাচালানের পথ চেনে এতে অপরাধে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই সমাধান।
নিরাপত্তা রাজনীতির নতুন উদ্বেগ
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রামমুখী প্রবেশ বেড়েছে। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন এদের কোনো কোনোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিছিল-সমাবেশে ব্যবহার করা হতে পারে।
নোয়াখালীর ভাসানচরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের কর্মকর্তা জানান, ভাসানচরে প্রবেশ-প্রস্থান কঠোর নজরদারিতে আছে। নদী ও সাগর পথে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।
তবু স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, রাতের অন্ধকারে ছোট নৌকার গতিবিধি পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
পতাকানিউজ/কেএস

