একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার পরিবার, বিশেষ করে মা ও বাবা। শিশুরা তাদের চারপাশের পরিবেশ, বড়দের আচরণ এবং পারিবারিক সংস্কৃতি থেকেই শিখে বড় হয়। তাই একজন শিশু কীভাবে বেড়ে উঠবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে তার বাবা-মা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের আচরণের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ কিন্তু নেতিবাচক অভ্যাস ও আচরণ শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, যা তার ভবিষ্যৎ জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে তুলে ধরা হলো এমন কিছু আচরণ, যেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত অভিভাবকদের।
১. অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করা
শিশুরা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়। অনেক অভিভাবক নিজের অজান্তেই সন্তানের সঙ্গে অন্য শিশুর তুলনা করে ফেলেন। যেমন: “দেখো, তোমার বন্ধুটি কত ভালো রেজাল্ট করেছে” কিংবা “সে কত সুন্দর গান গায়, তুমি পারো না কেন?” এমন কথা শিশুর মনে হীনমন্যতা তৈরি করতে পারে। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং একধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ: প্রতিটি শিশুই আলাদা এবং তার নিজস্ব প্রতিভা ও আগ্রহ রয়েছে। তাই তুলনা নয়, বরং উৎসাহ দিন নিজের পথ খুঁজে নিতে।
২. আবেগ চেপে রাখতে শেখানো
শিশুরা স্বভাবতই আবেগপ্রবণ হয়। অনেক সময় বাবা-মা শিশুর কান্না বা রাগকে ‘বেইমান’ বা ‘অভদ্রতা’ বলে দমন করতে চান। মেয়ে হয়ে কাঁদছো কেন?, ছেলে হয়ে কান্না পায়? এমন বাক্য তাদের আবেগ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
ফলাফল: দীর্ঘমেয়াদে শিশু তার আবেগ প্রকাশে সংকোচ বোধ করে এবং মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমাধান: শিশুকে তার অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ দিন। তাকে বুঝিয়ে বলুন কীভাবে অনুভূতিগুলো সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়।

৩. রুটিনহীন জীবনযাপন
আজকাল অনেক শিশুই স্কুলের পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিতে জড়িত। কিন্তু অনেক পরিবারে এখনো সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা অনুপস্থিত। দিনের পর দিন শিশুদের শুধু পড়াশোনার পেছনে দৌড় করানো হয়, যার ফলে মানসিক চাপ বেড়ে যায়।
ফলাফল: শিশুরা হাঁপিয়ে ওঠে, সৃজনশীলতা নষ্ট হয় এবং আনন্দময় শৈশব হারিয়ে ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: একটি সুষম রুটিন তৈরি করুন, যেখানে থাকবে খেলা, বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া, আর নিজস্ব পছন্দের কাজ করার সুযোগ।
৪. সময় ও ভালোবাসার ঘাটতি
শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বোধ করে বাবা-মায়ের সময় ও ভালোবাসার। কিন্তু অনেক বাবা-মা ব্যস্ততা বা মোবাইল ফোনে আসক্তি, দৈনন্দিন কাজ, অফিসের কাজ আরও নানা কারণে সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দেন না।
ফলাফল: শিশুর মনে একাকীত্ব তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসহীনতা বা আচরণগত সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
উপায়: প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় শিশুদের সঙ্গে কাটান। তাদের সঙ্গে কথা বলুন, খেলুন, এবং তাদের অনুভূতির মূল্য দিন।

শিশুর বেড়ে ওঠার পথটা সুন্দর করতে হলে প্রয়োজন সচেতন অভিভাবকত্ব। তাদের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান, এবং সহানুভূতির আচরণই গড়ে তুলতে পারে ভবিষ্যতের এক সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী এবং ইতিবাচক প্রজন্ম। সন্তান লালন-পালনে ভালোবাসা ও যত্নের বিকল্প নেই। মা-বাবার সামান্য সচেতনতাই শিশুদের মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পতাকানিউজ/এনএফএম

