অভ্যুত্থানের দেশে ভোট উৎসব! অভ্যুত্থান মানেই তো রক্ত সাগরে ভাসা। সেই রক্তসাগরে কি করে উৎসব হয়! -শুনতে বিস্ময়কর হলেও বাস্তবে তাই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার নতুন বাংলাদেশ বির্নিমানের লক্ষ্যে পৌণে ১৩ কোটি ভোটার উৎসবের সারিতে দাঁড়াবে।
এই ভোট উৎসবের পেছনের ইতিহাস কালো। সেই ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল। যুগের চেয়েও লম্বা সময় বাংলাদেশ ছিল ফ্যাসিবাদের ঘূর্ণিপাকে। টানা তিন দফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে চরম বিতর্কের মধ্য দিয়ে। কখনো দিনের ভোট, কখনো বা রাতের ভোট। সব মিলিয়ে ‘কণ্ঠরোধ’ অবস্থার শিকার হয়ে মৃত্যুসম কাতরযন্ত্রণায় পড়ে বাংলাদেশ।
তারপর ‘মৃত্যুপথযাত্রী’দের মতোই একসময় রুখে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। তরুণরা চাকরিতে কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী ‘রাজাকার’ শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ ঘটে তারুণ্যের রক্তে।
রুখে দাঁড়ানো তারুণ্যের কাছে নতি স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যান ভারতে। বিজয়ী হন ছাত্র-জনতা। সেই বিজয়ের প্রথম চাওয়া বা অন্যতম দাবি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি বাংলাদেশ।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের শুধু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়। এটি ফ্যাসিবাদ বিদায় করে নতুন বাংলাদেশের নতুন যাত্রার শুভ সূচনার মাহেন্দ্রক্ষণ। এই মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতীক্ষায় ছিল দেশের আপামর গণতন্ত্রকামী জনতা।
ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে নতি স্বীকারকারী শেখ হাসিনার দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন দর্শকের ভূমিকায়। যদিও বাংলাদেশের ৩৫ শতাংশের বেশি ভোটারের সমর্থন ছিল দলটির প্রতি। কিন্তু আগ্রাসী নেতৃত্বের কু-মন্ত্রণার শিকার হয়ে দলটি ছিটকে গেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় অগ্রণী ভূমিকাপালনকারী দলটি। এখন ওই দলের ভোটাররাও যেন হয়ে গেছেন দাবার ঘুঁটি। প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক জোট বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী ভোট নিজেদের বাক্সে পেতে ভোটের প্রচারকালে নানা কৌশলী মন্ত্রণা দিয়েছেন ভোটারদের কানে।
সে যাই হোক, আজ রাত পোহালেই কাল ভোরে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের আশায় কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটারের দীর্ঘ লাইন দেখা যাবে। ভোট উৎসব হবে পুরো দিন। আর সন্ধ্যা-রাতের দিকে হয়তো ফল পাওয়া শুরু হবে।

এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক গণভোট। এবার ভোটাররা দুটি করে ভোট দেবেন। গণভোট ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। আর পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে। এইক্ষেত্রে তারুণ্যের আন্দোলনের ভিত্তি ‘হ্যাঁ’ ভোট।
মহাগুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সম্ভব সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। তাই নিরাপত্তার ঘাটতি হবে না বলে দাবি সরকারপক্ষের।
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট সংসদীয় আসন ৩০০টি। এর মধ্যে শেরপুর জেলার একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত হয়েছে। ওই আসন ছাড়া ২৯৯ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই মূল ভোট যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। বাকি দলগুলোর বেশ কিছু প্রার্থী জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন। আবার বিএনপিসহ কয়েকটি দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন অনেকে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে প্রতি আসনে একজন করে নির্বাচিত হবেন ৩০০ জন (১ আসনে ভোট স্থগিত)। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৯৫৮টি। এর মধ্যে ডাকযোগে ভোটকেন্দ্র ২৯৯টি।

ভোটের দিনকে নির্বিঘ্ন রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকছেন। প্রায় দেড় লাখ পুলিশ, ১ লাখ সেনা সদস্য, ৩৭ হাজার বিজিবি, ৯ হাজার র্যাব, এবং সাড়ে পাঁচ লাখ আনসার ভিডিপি সদস্য মাঠে সক্রিয় থাকছেন। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারিক হাকিমদের বড় একটি অংশ মাঠে থাকবেন। যাতে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে গড়ে তোলা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ১৩–১৮ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন কেন্দ্রে কেন্দ্রে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রায় ২৪ হাজার মাঝারি এবং ৮ হাজার ৭০০ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। এ ছাড়াও সিসিটিভি, বডি ক্যামেরা এবং ড্রোন দিয়ে ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
ভোট উৎসবে যোগ দিতে শহর ছেড়ে বিপুল সংখ্যক ভোটার ইতোমধ্যেই গ্রামে গিয়েছেন। অর্থাৎ, নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে গেছেন ভোটাররা। যানবাহনে উপচে পড়া ভিড় ঠেলে কেন্দ্রের কাছে বা নিজ বাড়িতে অবস্থান নেওয়া ভোটাররা এখন ভোটের মাত্র ১২ ঘণ্টার কিছু সময় আগে চূড়ান্তভাবে বিশ্লেষণ করছেন কাকে ভোট দেবেন? কিংবা কাকে দেবেন না।
আর প্রার্থী এবং সমর্থকেরা শেষ মুহূর্তে প্রচারণা বন্ধ হলেও কৌশলে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছেন। এর মধ্যে কেন্দ্রের ব্যয় নির্বাহ, কেন্দ্র ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরির পর ‘অপকৌশল’ রয়েছে। যা বাংলাদেশে ভোটগ্রহণের পূর্ব মুহূর্তের চিরায়িত দৃশ্য।
আবার অভিযোগ আছে, প্রচারণা বন্ধের পর ভোটাররা যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রস্তুতি নেন, তখনই ‘আর্থিক’ প্রলোভন বা নগদ টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করেন প্রার্থীরা। এর মাধ্যমে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু হয় বাংলাদেশে—এমন অভিযোগও বেশ পুরনো। যা এই নির্বাচনেও উপস্থিত।
সবমিলিয়ে বাংলাদেশ আগামীকাল ভোট উৎসব করবে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে সেই ভোট উৎসবে সবাইকে আনন্দের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আজ বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ভোটারদের অবহিত করার কথা রয়েছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোট উৎসবের পর নতুন বাংলাদেশের হাত কোন দল বা জোটের কাঁধে গিয়ে পড়বে তা এখনো বলা মুশকিল। যদিও একাধিক জনমত জরিপে বিএনপিকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে এসেছে।
পাশাপাশি বলা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর এবার বড় ধরনের উত্থান হতে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারুণ্যের দল এনসিপি। এই জোট ক্ষমতায় যাচ্ছে—এমন দাবি করছে জোটটি। ভোটের মাঠের এমন দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়—তা বুঝতে বা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের চূড়ান্ত ফল পাওয়া পর্যন্ত। কারণ, জনমত জরিপ যাই বলুন না কেন, শেষ মুহূর্তে ভোটাররা যে সিদ্ধান্ত নেন— সেই সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটে ব্যালটে।
তাই, দল-জোটে এগিয়ে-পিছিয়ে থাকার চেয়ে বৃহস্পতিবার দিনটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন তথা ভোটগ্রহণ। এরপরও ব্যালট গণনায় চূড়ান্ত রায় পাবে বাংলাদেশ।
-পতাকানিউজ/এসএমআর

