স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় ও শক্তিশালী। জিডিপির আকার বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি—শ্রমিক শ্রেণির বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। কম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যের মধ্যে পড়েই এগোচ্ছে দেশের শ্রমজীবী মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে শ্রমিকদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। অথচ এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি শ্রমিকবান্ধব কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি স্পষ্ট।
অর্থনীতি বড়, কিন্তু শ্রমিকের অংশ ছোট
বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল দীর্ঘদিন ধরে দুটি বিষয়কে সামনে রেখে প্রচারিত হয়েছে -অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সস্তা শ্রম। এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বিনিয়োগবান্ধব ভাবমূর্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও শ্রমিকরা এর সুফল সমানভাবে পাচ্ছেন না।
দেশের অর্থনীতির তিন প্রধান ভিত্তি -কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী আয়। এই তিন খাতের সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত শ্রমিকরা। অর্থনীতিকে সচল রাখার মূল শক্তি তারাই, কিন্তু উন্নয়নের লাভ তাদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে সীমিতভাবে।
অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, বাংলাদেশের বড় শক্তি হলো কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। তবে দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় বাধা। তার মতে, জনশক্তিকে এখনো পুরোপুরি সম্পদে রূপান্তর করা যায়নি, ফলে শ্রমিকদের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
শ্রমিকের সংজ্ঞা বিস্তৃত, বাস্তবতা আরও কঠিন
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরির বিনিময়ে কাজ করা দক্ষ-অদক্ষ সবাই শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ শ্রমজীবী। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।

তবে শ্রমবাজারে প্রবেশের তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অনেক কম। গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে যেখানে ২২ লাখ নতুন শ্রমশক্তি যোগ হচ্ছে, সেখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র ৬ লাখের মতো। ফলে বেকারত্ব এবং আংশিক কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে বেকার প্রায় ২৭ লাখ হলেও বেসরকারি হিসাব বলছে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি নেই ৯৬ খাতে
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও দেশে জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন করা হয়নি। মোট ১৪২টি খাতের মধ্যে মাত্র ৪৬টি খাত মজুরি বোর্ডের আওতায় রয়েছে। আবার এসব খাতের অনেকগুলোতেই এক দশক ধরে মজুরি বাড়েনি।
শ্রমিক নেতাদের দাবি—ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, রেশন ব্যবস্থা চালু, আবাসন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম মানের সঙ্গে অসঙ্গত আইন বাতিল করা জরুরি।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ৮৫% শ্রমিক
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কাজ করেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। দোকান, ছোট ব্যবসা, কৃষিকাজ বা অনানুষ্ঠানিক সেবাখাতে কর্মরত এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য নেই নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি বা আইনি সুরক্ষা।

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে শ্রমিক কল্যাণে ২৫টি সুপারিশ করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত।
মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, মজুরি বাড়ছে না
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ আয় বাড়লেও পণ্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। ২০২৫ সালে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ১৪ লাখ মানুষ, আর ২০২৬ সালে আরও ১২ লাখ মানুষ দরিদ্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের শ্রমিক।
যুদ্ধের প্রভাব: অর্থনীতিতে ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে দেশের ক্ষতি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমে গেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকলেও নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী তা কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে সব খাতে, বিশেষ করে শ্রমিকদের ওপর।
আয় বৈষম্যের ভয়ংকর চিত্র
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে জাতীয় আয়ের ৪৪ শতাংশ। মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ পাচ্ছে ধনী ৩০ শতাংশ মানুষ। ফলে আয় বৈষম্য এখন গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

শ্রম সংস্কার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৮ হাজারের বেশি শ্রমিক। অনেকেই ক্ষতিপূরণ পাননি।
মালিকপক্ষের বক্তব্য
শিল্প মালিকরা বলছেন, শ্রমিকদের কল্যাণে তারা কাজ করছেন। রপ্তানি আয়ের একটি অংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেওয়া হয়। পোশাক শিল্পে স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রয়েছে।
তাদের মতে, আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সব দাবি একসঙ্গে পূরণ করা সম্ভব হয় না।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৬২ লাখ কোটি টাকা। সেবা খাতের অবদান ৫৬ শতাংশ, শিল্প ৩৩ শতাংশ এবং কৃষি ১৩ শতাংশ। মাথাপিছু আয় প্রায় ২,৭৮৪ ডলার।
এই অগ্রগতির পেছনে শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি-এ বিষয়ে সবাই একমত। কিন্তু তাদের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
মে দিবসের প্রশ্ন
প্রতি বছর মে দিবসে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়।
অর্থনীতির ভিত্তি যাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে, সেই শ্রমিকদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-উন্নয়নের সুফল তারা কবে পাবে?
-পতাকানিউজ

