অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে দেশে শিগগিরই জ্বালানি তেলের দাম পুনঃনির্ধারণ হতে যাচ্ছে। যদিও কবে নাগাদ এই সিদ্ধান্ত সরকার জানাবে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। কিন্তু এবার মন্ত্রীর কথায় পরিষ্কার বার্তা পাওয়া গেছে, সরকার গত ১ এপ্রিল জ্বালানির দাম পুনঃনির্ধারণ না করলেও দ্রুতই করবে। কারণ, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম প্রায় ১০০ বেড়েছে। এমতাবস্থায় সরকারের হাতে বিকল্প নেই বললেই চলে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে জ্বলন্ত উনুন হয়ে উঠে। যুদ্ধের মুখে ইরান বন্ধ করে দেয় হরমুজ প্রণালী। এই জলপথ ধরেই বাংলাদেশে আসে তেল-গ্যাস। এখন সেই পথটি রুদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানির সংকট শুরু হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন জ্বালানি সংকট চলছে। সংকট নিরসনে বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
এমন বাস্তবতায় মন্ত্রী শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। ওই সময় তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্য নিয়ে সরকার ইতোমধ্যেই আলাপ করেছে। উচ্চমূল্যের কারণে সরকারের তহবিলে চাপ পড়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে জনগণকে সরকারের দেওয়া অন্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রভাব পড়বে।
এর আগে মন্ত্রী কোরীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (কেইপিজেড) অনুষ্ঠিত চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির (সিআইইউ) শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন। সেখানে মন্ত্রী প্রধান অতিথি ছিলেন। ইয়ং ওয়ান-সিআইইউ একাডেমিক এক্সিলেন্স স্কলারশিপ প্রোগ্রামের আওতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সিআইইউর সহকারী রেজিস্ট্রার রুমা দাশের সঞ্চালনা ও উপাচার্য এস এম নুরুল আবসারের সভাতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কেইপিজেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ইয়ংওয়ান করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাচেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কিহাক সুং।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কেইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিআইইউর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান লুৎফি এম আইয়ুব ও সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক প্রমুখ।
যা বললেন অর্থমন্ত্রী
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটের মূল কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ তেল ও গ্যাস আমদানি ওই অঞ্চল থেকে হওয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি সরাসরি দেশের সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক সংকট। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ মানেই আমাদের জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়া। তবে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বসে নেই—বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি কিনতে যে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে, তা দেশের বাজেট ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ওপরও চাপ বাড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়া অনিবার্য। মন্ত্রীর ভাষায়, ‘তেলের দাম বাড়লে সার, খাদ্যপণ্যসহ সব কিছুর দাম বাড়ে। তবে এখনো আমরা অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছি। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও বাংলাদেশে এখনো ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়নি।’
তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে একটি পর্যায়ে গিয়ে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দাম বেশি হলেও জ্বালানি কেনা ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ জ্বালানির ঘাটতি মানেই শিল্পকারখানা, কৃষি, উৎপাদন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন-সব কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।’
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সক্ষম হয়েছে। ক্রয়প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে, জ্বালানিবাহী জাহাজ নিয়মিত আসছে এবং বড় ধরনের কোনো সংকট দেখা দেয়নি।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রায় সব দেশই এই সংকটে আক্রান্ত। তবে বাংলাদেশের জন্য আশার খবর হলো-রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে এবং তৈরি পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। রপ্তানি আয় বৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘আমাদের উদ্যোক্তাদের সহনশীলতা ও সক্ষমতার মাধ্যমে এই সাময়িক অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারব।’
পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা আসবে। লক্ষ্য হচ্ছে এটিকে প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এতদিন বড় বিনিয়োগের জন্য সবাই ব্যাংকের ওপর নির্ভর করায় ব্যাংকিং খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বড় বিনিয়োগ যেন পুঁজিবাজার থেকে আসে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। এতে বিনিয়োগকারী ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো উপকৃত হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
-পতাকানিউজ

