ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুখে দেশের রাজনৈতিক পরিসর ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় দলের ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। বিশেষ করে, দলের ভোটব্যাংক কোথায় যাবে, তা এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রধান কৌতূহল।
সূত্র বলছে, বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই—আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বিএনপি প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান না দেখালেও, তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ভোটারদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন। একইভাবে, জামায়াতও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সক্রিয়; তারা স্থানীয় নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিচ্ছে, সংখ্যালঘু আসনে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটের ভাগাভাগি নির্ভর করছে তিনটি মূল ফ্যাক্টরের উপর—প্রার্থীর আদর্শের সঙ্গে ভোটারের মিল, ভোটার ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এবং আগস্ট ৫-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রার্থীদের বা তাদের দলের আচরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, স্থানীয় প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে সামাজিকভাবে যুক্ত থাকলে ভোটে উপস্থিতি বাড়ে।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন না। যাঁরা আসবেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে পারেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও মনে করেন, প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি সীমিত হবে—শুধু ৫-৭ শতাংশ ভোট পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যেসব “সফট সাপোর্টার” রয়েছেন, তাঁরা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভোট দিতে পারেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বর্তমানে দুই ভাগে বিভক্ত। এক অংশ শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করে, এদের ভোট বিএনপির পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্য অংশ শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করছে, তবে এদের মধ্যেও দুই ধরনের ধারা রয়েছে—একটি অংশ শেখ হাসিনার নির্দেশ মানে, অন্য অংশ নিজস্ব হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী ভোট দেবে। বিশেষ কিছু এলাকায় জামায়াতের প্রভাবও আওয়ামী লীগের ভোট ভাগে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, বিএনপি ও জামায়াতের জন্য পরিস্থিতি সুবিধাজনক। বিএনপি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি, কৌশলী অবস্থান নিয়েছে, যা ভোটের মাঠে সুবিধা সৃষ্টি করে। জামায়াতের ক্ষেত্রে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমূলক কর্মসূচি এবং আদালতের রায়ের পর তাদের সক্রিয়তা লক্ষ্যনীয়।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানও নির্দেশ করে, ১৯৯১–২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট অংশগ্রহণ ও জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে ওঠা-নামা করেছে। তবে ২০০৮ সালের পর দলের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং নির্বাচনে জয়ের আত্মবিশ্বাসও কমে যায়। অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াতের ভোট হার ও লাভও প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে, গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের রাস্তায় সমর্থন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভোটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে আওয়ামী লীগের ভোট সর্বাধিক ২০ শতাংশ হতে পারে। এই অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগের ভোট ‘টার্গেট’ করার পরিকল্পনা এবং কৌশলগত উদ্যোগ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
পতাকানিউজ/এনটি

