চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আবদুল জব্বারের বলীখেলার ১১৬তম আসরের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। সেবার রানার্সআপ হন একই জেলার রাশেদ। এর আগে ১১৫তম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন সেই বাঘা শরীফ।
করোনা মহামারীর কারণে দুবছর (২০২০-২১) আবদুল জব্বারের বলীখেলা হয়নি। এরপর ২০২২ সালে ১১৩তম আসরে কুমিল্লার শাহজালাল বলীকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন চকরিয়ার তারেকুল ইসলাম জীবন। পরের বছর ২০২৩ সালে ১১৪তম আসরে কুমিল্লার জীবনকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হন শাহজালাল বলী। এর আগে বলীখেলার ১১০তম আসরে কুমিল্লার শাহজালাল ও ১০৯তম আসরে চকরিয়ার জীবন চ্যাম্পিয়ন হন।
আজ, শনিবার, ২৫ এপ্রিল বলীখেলার আসরের ১১৭ তম আসরে কে হচ্ছেন চ্যাম্পিয়ন এ নিয়ে নগরজুড়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা, আলোচনা। আজকের আসরেও অংশগ্রহণ করবেন সেই বাঘা শরীফ। এছাড়া রাশেদ ও বাঘা শরীফসহ অন্যান্য বলীও অংশ নিতে পারেন।
মহানগরীর লালদীঘি মাঠে আজ বিকেল ৩টায় শুরু হবে এ বলীখেলা। খেলায় অংশ নিতে ইতিমধ্যে ১০০শ এর বেশি বলী নাম অন্তর্ভুক্তি করিয়েছেন বলে জানা গেছে। আর ১১৭তম আসরের চ্যাম্পিয়নকে দেখতে চোখর রাখতে হবে লালদীঘি মাঠে।
আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটির আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান পতাকানিউজকে বলেন,, এবারও শতাধিক বলী খেলায় অংশ নিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের মধ্য থেকে আমরা যাচাই-বাছাই করছি। ১১৬তম আসরের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার বাঘা শরীফ বলীখেলায় অংশ নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, আগামী ২৫ এপ্রিল বিকেল ৩টায় বলীখেলার ১১৭তম আসর লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। শুক্রবার থেকে শুরু হবে দুদিনের বৈশাখী মেলা। এবার এসএসসি পরীক্ষার কারণে একদিন মেলা কমানো হয়েছে।’
বলীখেলার উদ্বো ধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। প্রধান অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। স্পন্সর হিসেবে রয়েছে বাংলালিংক।’
এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক, দিদার বলী ২০০১ সালে অংশগ্রহণ করে সিদ্দিক বলীর সঙ্গে লড়ে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হন। ২০০২ সালে মর্মসিং-এর সঙ্গে বলী খেলে হন রানার্স আপ। ২০০৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মর্মসিং-এর সঙ্গে বলী খেলে দিদার বলী যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হন। ২০০৭ সালে দিদার আবার এককভাবে চ্যাম্পিয়ন হন।
২০০৮ ও ২০০৯ সালে এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী লড়াই করে শেষ পর্যন্ত যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হন। তখন অভিযোগ উঠে তারা উভয়েই পাতানো খেলা খেলে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত একই অভিযোগে তাদের মাঠ ছাড়তে হয়। সেইবার ১০৩তম আসরে শিরোপা জিতে নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অলি বলী। রানার্সআপ হন রাউজানের ইকবাল বলী। সেইবারের বলীখেলায় ছিল কেবলই নতুনের জয়জয়কার। দর্শকরা দারুণ উপভোগ করেছিল খেলাটি। রামু এলাকার দিদার বলী ও মর্ম সিং ত্রিপুরা বলীখেলার শততম আসরেও যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হন। ১০১তম আসরে দিদার বলী ও মর্ম সিং ত্রিপুরার মধ্যে যেকোনো একজন চ্যাম্পিয়ন হবেন এটাই আশা করেছিল সবাই। তারা দুজনই প্রায় ৫০ মিনিট লড়াই করেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। মঞ্চ থেকে প্রধান অতিথি ও সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বার বার ঘোষণা করছিলেন বলীখেলার শেষ নয় বছরের ইতিহাসে মর্ম সিং ও দিদার বলী যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। সবার মুখে মুখে ছিল পাতানো খেলার অভিযোগ। সেই কারণে খেলার মাঠ থেকে দুইজনকেই বের করে দেন মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং দুইজনকে আজীবন বহিষ্কারের ঘোষণা দেন। ফলে খেলায় নাটকীয়ভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন টেকনাফের আলম বলী। রানার্স আপ হন মিরসরাইয়ের লিয়াকত বলী। তারা ৭ মিনিটে খেলে ইতি টানেন।
পাতানো খেলার দায়ে বহিষ্কৃত দিদার বলী ও মর্ম বলী পরের দুটি আসরে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে আবেদন করে ক্ষমা চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে দিদার বলীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছিল কমিটি। কিন্তু সেইবার তিনি বলীখেলায় অংশ নিতে পারেননি ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে। মর্ম বলীও খেলায় অংশ নিতে না পারার কথা জানিয়ে দেন। ফলে ২০১১ সালের নতুন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন টেকনাফের অলি বলী।
পরিশেষে জব্বারের আজকের প্রতিযোগিতায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের দূর-দূরান্ত থেকে নামি-দামি অনেক বলী অংশগ্রহণ করবেন। পাশাপাশি অংশ নেবেন তরুণ ও অখ্যাত অনেক উঠতি এবং অপেশাদার বলীও।
লালদীঘি ময়দানজুড়ে এবং এর আশপাশের এলাকার সুউচ্চ স্থান থেকে হাজার হাজার ক্রীড়ামোদী দর্শক প্রচণ্ড রোদ ও তীব্র গরম উপেক্ষা করে এ বলীখেলা উপভোগ করবেন।
প্রসঙ্গত, ১০৩ বছর আগে ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ নগরের লালদীঘি মাঠে এ বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘বলী’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘কুস্তি’ বলীখেলা নামে পরিচিত।
পতাকানিউজ/আরবি

