‘তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে। মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে। যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’ আজ ১২ রবিউল আউয়াল। আজ ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলার দিন। আজ গোটা জগতের মুসলমানদের আবেগ-অনুরাগ আর উচ্ছ্বাসে একাকার হওয়া প্রাণ-মন আকুল করা দিন। আজ প্রাণের আবেগ মেখে পড়ার দিন ‘বালাগাল উলা বিকামালিহি/কাশাফাত দুজা বিজামালিহি/হাসুনাত জামিঊ খিসালিহি/সাল্লু আলাইহি ওয়ালিহি…’।
আজ, বুধবার পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী রহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদুল মুরসালিন খাতামুন্নাবিয়ীন তাজদারে মদীনা জগতকুল শিরোমণি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাল্লামের জন্ম ও ওফাত দিবস। কবির ভাষায়- তিনি আলোর মিনার নূর মদিনার জান্নাতি বুলবুল/তিনি যষ্টি মুকুল বৃষ্টি বকুল বৃষ্টি ভেজা ফুল/নিখিলের চির সুন্দর সৃষ্টি মুহাম্মদ রাসুল…।
আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। দিবসটি উদযাপনে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জশনে জুলুস, আলোচনা, মিলাদ, দোয়া মাহফিল, ওরশ প্রভৃতি। রাষ্ট্রীয়ভাবেও পালিত হয় এ দিনটি। আজ সরকারি ছুটির দিন।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪শ’ বছর পূর্বে ৫৭০ খৃস্টাব্দে এ দিনে সুবহে সাদেকের সময় মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমেনার কোল আলো করে প্রিয় নবী (দ.) আসেন এই ধরায়। জন্মের পূর্বেই পিতৃহারা হন এবং জন্মের অল্পকাল পরই বঞ্চিত হন মাতৃস্নেহ থেকে। অনেক দুঃখ-কষ্ট আর অসীম প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠেন। চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হওয়ার পর তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নবুওয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। অসভ্য বর্বর ও পথহারা মানব জাতিকে সত্যের সংবাদ দিতে তিনি তাদের কাছে তুলে ধরেন মহান রাব্বুল আলামীনের তাওহীদের বাণী।
কিন্তু অসভ্য-বর্বর আরব জাতি তাঁর (দ.) দাওয়াত গ্রহণ না করে নির্যাতন শুরু করে। বিভিন্নমুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে একের পর এক। আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যান তিনি। ধীরে ধীরে সত্যান্বেষী মানুষ তাঁর সাথী হতে থাকে। অন্যদিকে কাফেরদের ষড়যন্ত্রও প্রবল আকার ধারণ করে। এমনকি একপর্যায়ে তারা রাসুল (দ.) কে হত্যার পরিকল্পনাও গ্রহণ করে।
রাসুল (দ.) আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন এবং মদীনা সনদ নামে একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। মদীনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসাবে খ্যাত। এ সংবিধানে ইহুদী, খৃস্টান, মুসলমানসহ সকলের অধিকার স্বীকৃত হয় সমান্তরালে।

২৩ বছর শ্রম সাধনায় অবশেষে রাসুলে পাক (দ.) দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। বিদায় হজের ভাষণে তিনি আল্লাহর বাণী শুনিয়েছেন মানবজাতিকে ‘আজ থেকে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দেয়া হলো। তোমাদের জন্য দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা হিসাবে একমাত্র ইসলামকে মনোনীত করা হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (দ.) ইতিহাসের অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তাঁকে মানবজাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর ওপর নাযিল হয় ঐশী গ্রন্থ আল কোরআন। এখনো পর্যন্ত সারাবিশ্বে নির্ভুল, বহুল পঠিত হিসেবে বিবেচিত একমাত্র গ্রন্থ আল কোরআন।
প্রতি বছর ১২ই রবিউল আউয়ালকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসাবে পালন করে সারা মুসলিম বিশ্ব। এ উপলক্ষে জমায়েত হয়ে নবীজীর জীবন ও জীবনী আলোচনা করে এবং কাসীদা পড়ে থাকে। মিষ্টি-খাবার প্রভৃতি তৈরি করে বিতরণ করে। রাসুল প্রেমিকরা ভক্তিভরে দরুদ পাঠে মশগুল থাকেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণীতে মুসলমান ভাই-বোনদের প্রতি শুভেচ্ছা জানান এবং রাসুল (দ.)-এর আদর্শ নিজেদের জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় জশনে জুলুস বের করবেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের পীর সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভাণ্ডারী। নারায়ণগঞ্জে জুলুস বের করবেন পীরে তরীকত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী। তবে, দেশের সবচেয়ে বড়ো জুলুসের আয়োজন হয় চট্টগ্রামে। এতে প্রায় অর্ধকোটি নবীপ্রেমিক জনতা অংশগ্রহণ করেন।
এ জুলুস আয়োজন করে আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট চট্টগ্রাম। আজ চট্টগ্রামের জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন আওলাদে রাসুল, পীরে বাঙাল হযরতুলহাজ আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মাজিআ)। জুলুসটি চট্টগ্রাম ষোলশহরস্থ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকা-এ-কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া হতে সকাল ৮টায় শুরু হবে। র্যালিটি বিবিরহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর ২নং গেট, জিইসি মোড় হয়ে আবারও মুরাদপুর, বিবিরহাট, প্রদক্ষিণ পূর্বক জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রাঙ্গনে প্রত্যাবর্তন করে জামেয়া ময়দানে মিলিত হবে।
এখানে বেলা ১২টায় মাহফিল এবং মাহফিল শেষে নামাজে যোহর ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। জশনে জুলুসে শাহাজাদা হযরতুলহাজ আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ্ (মাজিআ) ও শাহজাদা সৈয়দ মেহমুদ শাহ অংশগ্রহণ করবেন। জশনে জুলুস সফল করতে ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ আলোকসজ্জা ও তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে জুলুস বরণে। আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট ও গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সুন্নী ত্বরীকা ভিত্তিক সংগঠন জশনে জুলুস সফল করতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদরাসা ও আলমগীর খানকায়ে কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়ায় গতকাল বিকেল থেকে দেশের দূর দূরান্ত থেকে বাসে করে নবীপ্রেমীরা জমায়েত হতে শুরু করেছে। সকাল থেকে পৃথক পৃথক মিছিল বিবিরহাট-মুরাদপুরে এসে এক মিছিলে পরিণত হবে।
পতাকানিউজ

