চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘ভিক্টরি ডে’ সামরিক কুচকাওয়াজে কিম জং উনের কন্যা কিম জু-য়ের উপস্থিতি উত্তর কোরিয়ার উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তাঁকেই ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার প্রথম নারী শাসক হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, কিশোরী বয়সী জু-য়ে বেইজিংয়ে পৌঁছান তাঁর বাবার সাঁজোয়া ট্রেন থেকে নেমে। চীনা কর্মকর্তারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। এভাবেই শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ।
যদিও কিম পরিবারের পক্ষ থেকে জু-য়ের নাম কিংবা বয়স আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো প্রকাশ করা হয়নি, তিনি দেশের ভেতরে বাবার সঙ্গে বহুবার জনসম্মুখে এসেছেন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, সামরিক মহড়া, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ওন্সান কালমা রিসোর্ট উদ্বোধনেও তাঁর উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়।
যদি কিম জং উন সত্যিই তাঁকেই উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে থাকেন, তবে ১৯৪৮ সালে কিম ইল-সুংয়ের হাতে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে চতুর্থ প্রজন্ম হিসেবে কিম জু-য়ে দেশটির শাসক হবেন।
জু-য়ের নাম প্রথম প্রকাশ্যে আনেন সাবেক মার্কিন এনবিএ তারকা ডেনিস রডম্যান, যিনি দাবি করেছিলেন ২০১৩ সালে পিয়ংইয়ং সফরে তিনি শিশুকন্যা জু-য়েকে কোলে নিয়েছিলেন। যদিও তিনি কখনো প্রকাশ্যে ভাষণ দেননি, তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাবার প্রায় সব সরকারি কার্যক্রমেই তাঁকে দেখা যাচ্ছে।

২০২২ সালে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে প্রথমবার জু-য়েকে গণমাধ্যমে দেখা যায়। এরপর থেকে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে ‘সম্মানিত কন্যা’ বলে উল্লেখ করা শুরু করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কিম জং উন ও তাঁর স্ত্রী রি সল-জুর তিন সন্তান রয়েছে—২০১০ সালে জন্ম নেওয়া এক ছেলে, ২০১৩ সালে জন্ম নেওয়া এক মেয়ে (ধারণা করা হয় তিনি জু-য়ে), এবং ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া আরেক সন্তান যার লিঙ্গ অজানা।
এই প্রথম আন্তর্জাতিক সফরে, বেইজিংয়ে নেভি ব্লু স্যুট পরে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে জু-য়ে বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবিরোধী জোটের এক নতুন রূপ গঠনের ইঙ্গিতবাহী এ সফরে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করছে—তাঁকেই উত্তর কোরিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ মাইকেল ম্যাডেন বলেন, ‘বর্তমানে কিম জু-য়ে-ই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রধান প্রার্থী। তিনি প্রোটোকলের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, যা ভবিষ্যতে তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
অতীতে কিম জং উনের বাবা কিম জং ইলকে কখনো বিদেশ সফরে যেতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখলেন কিম জং উন।

২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, জু-য়ে-কে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে কখন এবং কীভাবে এই পরিবর্তন হবে তা এখনও অস্পষ্ট। উত্তর কোরিয়ার শাসন কাঠামোতে সাধারণত উত্তরসূরিদের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করা হয়। আবার নারীর হাতে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব চলে যাওয়ার বিষয়ে সেনা ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মনোভাবও এখনো স্পষ্ট নয়।
কিম জং উন বর্তমানে সুস্থ আছেন বলে ধারণা করা হলেও তাঁর বয়স ৪১ বা ৪২। অতীতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কয়েক সপ্তাহ জনসমক্ষে না থাকায় উত্তরাধিকারের গুঞ্জন আরও জোরদার হয়েছিল।
বিশ্লেষক র্যাচেল মিনইয়ং লি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে কিম জু-য়ের উপস্থিতি শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আয়োজন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যদি এটি সত্যিই উত্তরাধিকার প্রস্তুতির অংশ হয়, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর এই আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা রাখবে।’
পতাকানিউজ/ওয়াইএস

