কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড পাহাড়তলী। শহরের প্রধান সড়কের কালু দোকান এলাকা হয়ে দক্ষিণের উপ-সড়ক ধরে একটু এগিয়ে গেলেই কচ্ছপিয়া পুকুর পাড় নামের এলাকাটি। এখানে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলে ‘নিহত জুলাইযোদ্ধা খোরশেদ আলমের বাড়ি কোথায়?’
উত্তর দিতে এগিয়ে আসেন স্থানীয়দের অনেকেই। সঙ্গী হন প্রতিবেদকের। সোজা পূর্ব সড়ক দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর যে বাড়িটি শনাক্ত করে দেয়, সেটি জরাজীর্ণ একটি বাড়ি। আভিজাত্যের ছাপ নেই।
বৃহস্পতিবার বিকালে টিনশেড আধাপাকা বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছিল আর্তনাদ। ঘরে প্রবেশে করতে দেখা মিলে নিহত খোরশেদ আলমের মা ছাবেকুন নাহার, মামা কামাল হোসেন ও খালা ছমিরা খাতুনসহ প্রতিবেশী কয়েকজন নারীর। ভেতরে মেঝেতে রক্তাক্ত জামা ও ছেঁড়া একটি প্যান্ট, এক জোড়া জুতা। যেগুলো দেখে দেখে একজন মায়ের আর্তনাদ ‘বাবা, তুমি কোথায়, আর কোন দিন ফেরত আসবে না, বাবা।’
কক্সবাজারে ছুরিকাঘাতে জুলাইযোদ্ধা ও ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলম প্রাণ হারিয়েছেন মঙ্গলবার রাতে। এর পর নানা ঘটনা ঘটে গেছে। ঘটনার পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল খোরশেদ আলমের সাথে থাকা নারী সমন্বয়ক তারিন সুলতানাকে। তার দেওয়া তথ্য মতে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে তারেক নামের এক যুবককে।
বুধবার কক্সবাজার জেলা পুলিশের প্রেসব্রিফিংয়ে জানানো হয়, তারেকই এ ঘটনার মুল হোতা। এ ঘটনায় তারিন আপাতত জড়িত বলে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে মায়ের জিন্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু খোরশেদের মা ছাবেকুন নাহার বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমার ছেলে হত্যার পরিকল্পনায় তারিন নামের মেয়েটি জড়িত। বাড়িতে অসুস্থ ছেলেকে অসংখ্যবার ফোন করে রাত সাড়ে ৯ টায় বের করে। রাত সাড়ে ১০টায় সমুদ্র সৈকতের কবিতা চত্বর নির্জন এলাকায় ছুরিকাঘাতে আমার ছেলেকে খুন করা হল। হত্যাকারীরা কিভাবে জানলো আমার ছেলে ওখানে গেছে।
ছাবেকুন্নাহার জানান, ঘটনার দিন (মঙ্গলবার) বিকেলে খোরশেদ বাড়িতে ছিলেন। শরীর অসুস্থ ছিল, কয়েকবার বমি করেছে। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিল। এর মধ্যে অসংখ্যবার ফোন আসে। ফোনে কথা বলার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন খোরশেদ।
তিনি বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোনে একজন জানান, খোরশেদ সদর হাসপাতালে। কথা শুনে দিশা হারিয়ে ফেলি, তাড়াহুড়া করে বোরকা পরে ঘর থেকে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখি, লোকজনের হইচই, কান্নাকাটি। আমাকে জানানো হয়, খোরশেদ আহত হয়েছে, চিকিৎসা চলছে। কিন্তু ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখি খোরশেদের রক্তমাখা নিথর দেহ।’
ছাবেকুন্নাহারের চার ছেলের মধ্যে সবার বড় খোরশেদ আলম। ২০১৭ সালে শহরের বায়তুশশরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (নিট) টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা শেষ করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে একই বিষয়ে বিএসসিতে অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি।
খোরশেদের ছোট ভাইদের মধ্যে মোরশেদ আলম মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে ডিপ্লোমা অধ্যয়নরত, নওশেদ আলম রামু সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং সবার ছোট দিদারুল আলম কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।

খোরশেদের মা জানান, ছেলে জুলাই আন্দোলনের পর কক্সবাজারে আসে। আগে থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সোথে জড়িত ছিলো।
খোরশেদের সেজ খালা ছমিরা খাতুন বলেন, ছিনতাইকারীরা আমার ছেলেকে (খোরশেদ) ছুরিকাঘাতে হত্যা করলো, আর সঙ্গে থাকা মেয়েটিকে কিছু করলো না। তার মোবাইল সহ সব ঠিক আছে? এটা কিভাবে হয়। আর সেই মেয়েটির ফোনেই তো আমার ছেলে ঘর থেকে বের হয়েছে। আর পুলিশ এত দ্রুত কিভাবে জানলো মেয়েটি জড়িত না।
কক্সবাজার শহরের পূর্ব পাহাড়তলী এলাকার শাহ আলমের ছেলে খোরশেদ আলম। বাড়িতে গিয়ে বাবাকে পাওয়া যায়নি। মামা কামাল হোসেন বলেন, ‘এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, আর তারিন এতে জড়িত।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত মামলা হয়নি। মামলার প্রস্তুতির কথা বলেছেন খোরশেদ আলমের ভাই নওশেদ আলম জানান, মামলার প্রস্তুতি চলছে। নানা কারণে মামলা দায়েরে বিলম্ব হচ্ছে।
-পতাকানিউজ/এনপি।

