আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে মাদারীপুর ও ঢাকায়। নিহতদের একজনের মরদেহ উদ্ধার হলেও আরেকজন এখনো নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, দ্রুত নিখোঁজ শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
নিহত শিক্ষার্থীদের একজন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। তিনি ফ্লোরিডার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। বাবা জহির উদ্দিন আকন ওরফে দিল মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি একটি বেসরকারি জীবনবিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভেঙে পড়া বাবা জহির উদ্দিন আকন বলেন, প্রতিদিনই মেয়ের সঙ্গে তাদের কথা হতো। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কথা হয়েছিল। তখন বৃষ্টি ক্যাম্পাসের ল্যাবে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে অন্যান্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো খোঁজ মেলেনি। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তাঁদের মেয়ের মৃত্যুর খবর জানায়।
শোকে মুহ্যমান বাবা বলেন, তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বৃষ্টিকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। পড়াশোনায় সব সময়ই মেধাবী ছিল বৃষ্টি। হঠাৎ এমন মর্মান্তিক পরিণতি পরিবার কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমে বৃষ্টি ও তাঁর সহপাঠী লিমনের সম্পর্ক নিয়ে যে প্রেমের কথা বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তারা কেবল ভালো বন্ধু ছিলেন।
বৃষ্টির শিক্ষাজীবন ছিল সাফল্যে ভরা। ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে গোল্ডেন জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি পাস করেন। পরে শহীদ বীরউত্তম লেফটেন্যান্ট আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে একই ফল নিয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পূর্ণ স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পান। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
বৃষ্টির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মাদারীপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। শনিবার বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এলাকার মানুষজন ভিড় করছেন এবং শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। স্থানীয়রা দ্রুত মরদেহ উদ্ধার করে দেশে আনা এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বৃষ্টির চাচাতো বোন তুলি আকন বলেন, সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় ভাইয়ের পোস্ট দেখে তাঁরা প্রথমে বৃষ্টির মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। এর আগে থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাঁর ভাষায়, কীভাবে এবং কেন তাঁকে হত্যা করা হলো-এ বিষয়ে এখনো কিছু জানা যায়নি। একই ঘটনায় বৃষ্টির এক সহপাঠীকেও হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবার জানতে পেরেছে। তাঁর মরদেহ উদ্ধার হলেও বৃষ্টির মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি।
আরেক চাচাতো বোন ফজিলা আক্তার বলেন, পরিবার কোনোভাবেই এই মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। তাঁদের একমাত্র দাবি-হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি এবং বৃষ্টির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা। বৃষ্টির চাচা দানিয়াল আকন বলেন, বৃষ্টি বেঁচে থাকলে দেশের জন্য বড় কিছু করতে পারতেন।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। এ ঘটনায় দূতাবাসই মূল ভূমিকা পালন করবে। তবে পরিবার সহযোগিতা চাইলে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল থেকে বৃষ্টি ও তাঁর সহপাঠী লিমন নিখোঁজ ছিলেন। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী। লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে এবং বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গবেষণা করছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন তাঁদের শেষবার ক্যাম্পাসে দেখা যায়।
এরপর শুক্রবার ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি লিমনের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন বলে জানা গেছে। পুলিশ তাঁকে তাঁর বাসা থেকে আটক করে।
ঘটনার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও উদ্বেগ ও শোক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশে পরিবার ও স্বজনরা অপেক্ষায় আছেন -কবে বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার হবে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ প্রকাশ পাবে। এখন সবার একটাই দাবি -দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।
-পতাকানিউজ

