রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আগামী শুক্রবার আলাস্কায় একটি বিশেষ বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠকটির মুখ্য আলোচনার বিষয় হবে- রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ। উল্লেখ্য, গত প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলছে এই যুদ্ধ।
বৈঠকের আগে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্ররা অন্যরকম কিছু করতে চাইবে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ বুধবার ‘ইউক্রেন-থিমযুক্ত’ একটি ভিডিও কল করবেন। এতে ট্রাম্প, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মতো ট্রাম্পের প্রিয় ইউরোপীয় নেতাদের অনেকেই উপস্থিত থাকবেন।
বুধবার জেলেনস্কির কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বৈঠকের জন্য তিনি বার্লিনে থাকবেন এবং পরে মার্জের সাথে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।
জার্মান চ্যান্সেলর মার্জ এবং অন্যদের বিবৃতি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, তারা ট্রাম্পকে অনুরোধ করবেন যেন তিনি পুতিনের সাথে জেলেনস্কি বা তার ইউরোপীয় মিত্রদের অগোচরে কোনো চুক্তি না করেন।
উল্লেখ্য, জেলেনস্কিকে আলাস্কায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ইউরোপীয় নেতারা মনে করেন, যুদ্ধাবসানের জন্য যেকোনো শর্তের আলোচনা সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শুরু হওয়া উচিত। তারা আরো বিশ্বাস করেন, ইউরোপীয় সৈন্যদের সাথে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার যেকোনো পরিকল্পনার জন্য ইউরোপের অনুমোদন অপরিহার্য।
ট্রাম্পের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রতিহত করা এবং তাকে পুতিনের প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য চ্যন্সেলর মার্জ এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের এটি সর্বশেষ প্রচেষ্টা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যডানপন্থী জার্মান চ্যান্সেলর মার্জ এবং অন্য নেতারা যেমন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার নিয়মিতভাবে ইউক্রেন বিষয়ে ট্রাম্পের সাথে আলোচনা করেন। এমনকি তারা প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে কিয়েভের প্রতি সমর্থন জারি রাখার জন্য আরো কিছু করার জন্যও উৎসাহিত করেন।
চ্যান্সেলর মার্জ রবিবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা এমনটা মেনে নেব না যে রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যকার আঞ্চলিক বিষয়গুলো ‘ইউরোপীয়দের ও ইউক্রেনীয়দের মাথার ওপর দিয়ে’ আলোচনা করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। আমি মনে করি মার্কিন সরকারও এটিকে একইভাবে দেখে।
চ্যন্সেলর মার্জ সব সময়ই ট্রাম্পকে একথা বুঝিয়ে এসেছেন যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে সাহসী এবং সিদ্ধান্তমূলকভাবে হস্তক্ষেপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুতিনকে যুদ্ধবিরতি এবং যুদ্ধাবসানের জন্য গঠনমূলক আলোচনায় বাধ্য করতে পারেন। এটি তার ট্রাম্পের কাছে চ্যান্সেলরের মূল অনুরোধ ছিল, যা ইউরোপের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের চাপের মতো অন্যান্য প্রধান বিষয়গুলোকেও ছাপিয়ে গেছে।
সর্বসম্প্রতি ট্রাম্পকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিষয়ে বেশ উচ্চকণ্ঠ দেখা যাচ্ছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনে রাশিয়ার অব্যাহত বোমাবর্ষণে তিনি হতাশ হয়েছিলেন। তিনি কিয়েভে সরবরাহের জন্য জার্মানি ও অন্যদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে সম্মত হন এবং যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে মস্কোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক শাস্তির হুমকিও দেন।
কিন্তু গত সপ্তাহে পুতিনের পরামর্শের পর ট্রাম্প আবার তার এ অবস্থান থেকে সরে যান। তিনি তাড়াহুড়ো করে আলাস্কা বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি দেখতে চান পুতিনের মনে কী আছে। তিনি কী তবে এমন একটি যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধাবসান ‘চুক্তি’ করতে চান, যার মধ্যে বর্তমানে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার দখলে থাকা জমির বিনিময়ও অন্তর্ভুক্ত?
চ্যান্সেলর মার্জ এবং তার মিত্ররা আলাস্কা বৈঠকের ফলাফল নিয়ে শঙ্কিত- এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর তাই তারা পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের নেতা এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটসহ ট্রাম্পের সাথে সুসম্পর্ক আছে এমন শীর্ষ ইউরোপীয়দের সাথে ভিডিও কলে আলোচনা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
ওদিকে, ইউরোপীয় নেতারা পুতিন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত সীমানা পুনর্নির্ধারণের কোনো আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা ইউক্রেনের যে ভূমি বর্তমানে রাশিয়ান দখলে নেই তা নিয়ে আলোচনা করতে চান না। জার্মান কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আরো বেশি তীর্যকভাবে কথা বলছেন। তারা যুদ্ধপূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশ রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতি-প্রস্তাবে সমর্থন না করার সম্ভাবনার প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেছেন।
তারা আরো আশঙ্কা করছেন যে ‘খারাপ শর্তে শান্তি’ পুতিনকে পশ্চিম ইউরোপের দিকে তার ‘প্রচেষ্টা’ অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করতে পারে। যেমন ন্যাটোর সদস্য লিথুয়ানিয়ার মতো প্রতিবেশীর দিকেও রাশিয়া সৈন্য পাঠাতে পারে।
জার্মান গণমাধ্যম ডাই জেইটের পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক আনা সাউয়েরব্রে বলেন, ‘এটা সত্যিই উদ্বেগের বিষয় যে পুতিন সাহসী বোধ করতে পারেন। অবশ্যই বার্লিনে যাওয়ার জন্য নয়, বরং অন্যান্য বাল্টিক দেশগুলোতে বা অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য।’
সর্বোপরি, ইউরোপীয়রা আশঙ্কা করছে যে পুতিন আলাস্কা বৈঠককে ব্যবহার করে ট্রাম্পকে এমন একটি ‘শান্তি চুক্তি’তে চুক্তিবদ্ধ করতে পারেন যা জেলেনস্কি কখনোই গ্রহণ করবেন না। এবং যার ফলে ট্রাম্প ইউক্রেনীয় নেতার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারেন। ট্রাম্প তখন যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন গোয়েন্দা-সহায়তা প্রত্যাহারের হুমকি দিতে পারেন (যেমনটি তার প্রশাসন সম্প্রতি সংক্ষিপ্তভাবে করেছিলো)।
তবে, ইউরোপ সেক্ষেত্রে ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তবে কাজটি আর আগের মতো অতটা সহজ থাকবে না। চ্যান্সেলর মার্জ এবং অন্যান্য নেতারা আমেরিকান সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।
সাংবাদিক সাউয়েরব্রে বলেন, বাস্তবতা ইউরোপীয় নেতাদের ট্রাম্পের কাছে ‘খুব দুর্বল অবস্থানে’ রেখেছে। ‘তারা আশা করতে পারে এবং প্রার্থনা করতে পারে’ এবং তাকে তোষামোদ করতে পারে। এর চেয়ে বেশি আর কিছু নয়।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-
পতাকানিউজ/আইবিএম

