বর্ণিল ফানুসে আলোকিত হয়েছে চট্টগ্রামের আকাশ। উৎসবে মুখর বন্দরনগরী চট্টগ্রাম উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধের কেশরাশিকে সম্মান জানাতে ও পুণ্য অর্জনের লক্ষ্যে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস উড়িয়ে বুদ্ধের কাছে শান্তি প্রার্থনায় মগ্ন ভক্তরা। সোমবার, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যার পর থেকেই নগরীর নন্দনকানন, চেরাগী মোড়, লাভলেইন, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ ও দেবপাহাড়ের আকাশে উড়েছে রঙিন সব ফানুস।
নগরজুড়ে যেন উৎসবের আবহ। নানা বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে মন্দির চত্বর। কেউ হাতে মোমবাতি, কেউ হাতে ফানুস সবাই প্রস্তুত আকাশে আলো ছড়িয়ে দিতে।

প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে দিনের শুরুতে হয়েছে বুদ্ধপূজা, সংঘদান, পিণ্ডদান, অষ্টপরিষ্কার দান ও প্রদীপপূজা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে সোমবার সন্ধ্যায় জনসমুদ্রে পরিণত হয় গোটা এলাকা। চেরাগী মোড় থেকে শুরু করে পুলিশ প্লাজা, লাভলেইন পর্যন্ত মানুষের ঢল। ছোট-বড় সবাই যেনো একত্র হয়েছে উৎসবের আলোকস্নানে স্নাত হতে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ ফানুসে আগুন দিচ্ছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন ফানুস উড়বে বলে। মুহূর্তেই একেকটা ফানুস ভেসে উঠছে আকাশে আলোর রেখায় সেজেছে চট্টগ্রামের রাত।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী জয়া তঞ্চঙ্গা এসেছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। আনন্দের দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘প্রতি বছর প্রবারণা পূর্ণিমায় মা-বাবার সঙ্গে নন্দনকাননে আসি। এবারও এসেছি। আমাদের পরিবার থেকেও দুটি ফানুস ওড়ানো হবে, প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
মোমিন রোডের সার্বজনীন বৌদ্ধ বিহার, আগ্রাবাদের শাক্যমুনি বিহার, কাতালগঞ্জের নবপতি বিহার এবং দেবপাহাড় পূর্ণাচর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারেও ছিলো একই চিত্র বিনয়, ভক্তি আর আনন্দে উদ্ভাসিত মুখ।
উৎসবকে ঘিরে নগরজুড়ে ছিলো ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নন্দনকানন এলাকাজুড়ে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর টহল ছিল দৃশ্যমান। নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির এবং আশপাশে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উৎসব সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন হচ্ছে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই।
প্রবারণা ঘিরে মন্দির চত্বরেই বসেছে ছোট ছোট দোকান। রঙিন ফানুস, খাবারের স্টল, শিশুদের খেলনা, ধর্মীয় সামগ্রী সব মিলিয়ে যেনো এক মিলনমেলা। পাশেই দেখা গেল এক বৃদ্ধা হাতে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে চুপচাপ বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘বুদ্ধের প্রতি প্রণাম জানাতে এসেছি। ফানুস তো আশীর্বাদ, যেনো আলো ছড়িয়ে পড়ে জীবনে।’
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মে ‘সাধুদের বর্ষাব্রত শেষে আত্মশুদ্ধির দিন’। ভিক্ষুরা একে অপরের ভুলত্রুটি স্বীকার করে নেয়, নতুনভাবে জীবন শুরু করে। আর সাধারণ মানুষের কাছে এটি আনন্দ ও পুণ্য অর্জনের দিন।
চট্টগ্রামের আকাশে ভেসে বেড়ানো একেকটা ফানুস যেনো শান্তির প্রতীক। ধর্মীয় সম্প্রীতির শহর চট্টগ্রাম এদিন হয়ে ওঠে আরও বেশি একতাবদ্ধ, আরও বেশি আলোয় ভাসা।
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

