বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার ইতিহাসজয়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বাক্ষী হয়েছে। এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতাকারী দুই হাজার ৭৪ প্রার্থীর মধ্যে অনেকেই ছিলেন বেশ আলোচিত। দলীয় অবস্থান, বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল প্রচারণা থেকে শুরু করে নানা কারণে বেশ কিছু প্রার্থী নির্বাচনের মাঠ সরগরম করেছিলেন। কেউ কেউ করেছিলেন স্যোসাল মিডিয়ার ‘হাইপ’।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন শেষ। শুক্রবার সকালের মধ্যেই সব কেন্দ্রের ফল প্রকাশিত হয়েছে। এখন দেখা যাক- আলোচিত প্রার্থী যারা ছিলেন, নির্বাচনের ব্যালটে কেমন ফল করলেন তারা। আলোচিতদের মধ্যে কেউ কেউ জয় পেয়েছেন। আবার কেউবা হারের স্বাদ গ্রহণ করেছেন।
রুমিন ফারহানার বড় জয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রুমিন ফারহানা। বিএনপির সাবেক এই নেত্রী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় আসেন।
নির্বাচনী প্রচারের সময় এক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছিল। তবে সমালোচনা ও আলোচনার মধ্যেও ব্যালটে শক্ত অবস্থান ধরে রাখেন তিনি।
বেসরকারি ফল অনুযায়ী, ১৫১টি কেন্দ্রে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোট বেশি পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।

হাসনাত আবদুল্লাহর ‘ক্লিন সুইপ’
কুমিল্লা–৪ (দেবীদ্বার) আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বড় জয় পেয়েছেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতা হিসেবে পরিচিত তিনি নির্বাচনী প্রচারেও আলোচনায় ছিলেন।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, আসনের ১১৬টি কেন্দ্রের সব কটিতেই জয় পেয়েছেন তিনি। মোট ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণ–অধিকার পরিষদের প্রার্থী জসীমউদ্দীন পেয়েছেন ২৬ হাজার ভোট।

পরাজয়েও সত্যিকারের লড়াকু তাসনিম জারা
পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বার্তা ও আধুনিক প্রচার কৌশলের কারণে আলোচনায় ছিলেন চিকিৎসক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে আগেই জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর এনসিপিতে যোগ দিয়ে ঢাকা–৯ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও পরে দলটির রাজনৈতিক জোট নিয়ে মতবিরোধের জেরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। নির্বাচনে অংশ নিতে দুই দিনে পাঁচ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আলোচনায় আসেন।
তবে ব্যালটে সেই জনপ্রিয়তা কাজে লাগেনি। ফুটবল প্রতীকে ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট পেয়ে তিনি তৃতীয় হয়েছেন।
দাঁড়িপাল্লার কৃষ্ণ নন্দীর পরাজয়
খুলনা–১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হলেও সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিচয়ের কারণে আলোচিত ছিলেন কৃষ্ণ নন্দী। জামায়াতের হিন্দু শাখার সাবেক সভাপতি হিসেবে তাঁর প্রার্থিতা নির্বাচনী আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
তবে ভোটের লড়াইয়ে তিনি পিছিয়ে পড়েন। বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তিনি পেয়েছেন ৭০ হাজার ৩৪৬ ভোট। বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী আমির এজাজ খান পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫২ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোট ব্যবধান ৫১ হাজার ৬।

বন্দরের কাছে গিয়েও তীরে উঠতে পারলেন না নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
ঢাকা–৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক ও ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিতদের একজন ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও বিভিন্ন বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১০৮টি কেন্দ্রে পাটওয়ারী পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৭২ ভোট এবং পোস্টাল ভোট ২ হাজার ৫৫৫। মোট ভোট দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ১২৭। অপরদিকে বিএনপির মির্জা আব্বাস পেয়েছেন মোট ৫৯ হাজার ৩৬৬ ভোট। প্রায় ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক লড়াই করেছেন তিনি।
আবদুল হান্নান মাসউদের জয়
নোয়াখালী–৬ আসনে ১১–দলীয় ঐক্যের আরেক আলোচিত প্রার্থী এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ছিলেন।
বেসরকারি ফল অনুযায়ী, তিনি পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৯৯ ভোট। বিএনপির মাহবুবের রহমান শামীম পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২১ ভোট।
সংগ্রামী মনীষা চক্রবর্তীও পৌঁছতে পারলেন না জয়ের বন্দরে
বরিশাল–৫ (সদর) আসনে বাসদ ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী অভিনব নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের কারণে আলোচনায় ছিলেন। শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে মাটির ব্যাংকে টাকা সংগ্রহ করে নির্বাচনী ব্যয় চালানোর উদ্যোগ মানুষের নজর কাড়ে।
এ আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী হয়েও ব্যালটে সুবিধা করতে পারেননি তিনি। বেসরকারি ফল অনুযায়ী, ২১ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

শাহজাহান চৌধুরী
চট্টগ্রাম-১৫ আসন থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি নির্বাচনের আগে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দেন।
তবে সাতকানিয়া আংশিক এবং লোহাগাড়ার রাজনীতিতে জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদ জয় পেয়েছেন। ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ২৩৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীন ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮১ ভোট।
জামায়াতের আলোচিত নেতা গোলাম পরওয়ার জ্বালাতে পারলেন জয় প্রদীপ
নানা ধরনের আলোচিত বক্তব্য দিয়ে ভোটে মাঠে উত্তাপ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল পদে দায়িত্বপালন করছেন। দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমান জয় পেয়েছেন। কিন্তু সেক্রেটারি জয়ের বন্দরে পৌঁছতে পারেননি। তার কিছু কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে ধারণা করা হয়।
খুলনা–৫ আসনে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬ ভোট। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোট ব্যবধান মাত্র ২ হাজার ৭০২।
ব্যালটে হারলেন আলোচিত ইসলামিক বক্তা গিয়াস উদ্দিন তাহেরী
হবিগঞ্জ–৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনে আলোচিত প্রার্থী মো. গিয়াস উদ্দিন তাহেরী মোমবাতি প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নেমেছিলেন। আলোচিত এই ইসলামিক বক্তা নানা সময়ের বক্তব্যের কারণে বেশ আলোচিত চরিত্র হয়ে নিজকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ব্যালট যুদ্ধে ভোটাররা আলোচিত বক্তার প্রতি সহানুভূতিশীল হননি। এই বক্তা পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৩২৩ ভোট। আর তার প্রতিদ্বন্ধি বিএনপির এসএম ফয়সল ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭২ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হন। তাহেরী হেরেছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৯ ভোটে।

মেঘনা আলম
বহুল আলোচিত ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী যুদ্ধ চলছিল বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে। মাঝখানে মডেল মেঘনা আলম আসেন প্রতিদ্বন্ধিরূপে। ফলে নতুন আলোচনা হয় মেঘনা আলমকে। অতীতেও নানা কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি আলোচিত সমালোচিত ছিলেন। ভোটের মাঠে এসে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেওয়া মেঘনা আলম অবশ্য ভোট পেয়েছেন মাত্র ৬০৮ ভোট।
-পতাকানিউজ

