উপমহাদেশের প্রয়াত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষশ্রদ্ধা জানিয়েছে ভারত। এই সময় সোমবার শিল্পীর বাড়ির আঙিনায় ভিড় জমল রাষ্ট্রীয় এবং শোকাহত মানুষের ঢলে।
সকাল থেকেই সেখানে ছিল গভীর শোকের আবহ, যেন এক যুগের বিদায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহর।
কাসা গ্র্যান্ডে অবস্থিত শিল্পীর বাসভবনে সকাল থেকেই ভিড় করতে থাকেন পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন এবং অসংখ্য অনুরাগী। শায়িত দেহে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে তাঁকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান-যা ভারতীয় সংগীত জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি। বেলা ২টা পর্যন্ত সেখানেই রাখা হয় তাঁর মরদেহ, যাতে শেষবারের মতো প্রিয় শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন সকলে।
শোকজ্ঞাপনে হাজির হন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফন্ডবীস। নীরবে দাঁড়িয়ে শেষশ্রদ্ধা জানান তিনি। তার পর একে একে পৌঁছাতে থাকেন বলিউডের তারকারা। উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা রিতেশ দেশমুখ, টাবু। সপরিবারে এসে শ্রদ্ধা জানান ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি শশীন টেন্ডুলকার।
এই সময় শিল্পীর পরিবারের সদস্যদের চোখে ছিল অশ্রু, আর ভক্তদের মুখ ছিল গভীর শোকের ছাপ। এই কণ্ঠ আর শোনা যাবে না, এই বাস্তবতাই যেন মেনে নেওয়া কঠিন।
বিকেল ৪টার দিকে শিবাজী পার্কে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। শেষযাত্রার আগে এই বিদায়পর্ব যেন এক বিশাল সাংস্কৃতিক শোকসভায় রূপ নেয়, যেখানে উপস্থিত প্রত্যেকেই নিজের মতো করে স্মরণ করেন এই সংগীত শিল্পীকে।
শনিবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আশা ভোঁসলে। দ্রুত তাঁকে ভর্তি করা হয় মুম্বইয়ের ব্রীচ ক্যান্ডি হাসপাতালে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বেগে ভরে ওঠে দেশজুড়ে তাঁর ভক্তদের মন। প্রার্থনা শুরু হয় সর্বত্র। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রার্থনাই ব্যর্থ হয়। রবিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই গুণী শিল্পী। চিকিৎসকরা জানান, একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা সংগীত জগতে। প্রখ্যাত শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সুরেলা পথচলা ছিল বহুল আলোচিত।
যদিও লতা মঙ্গেশকর আগেই প্রয়াত হয়েছেন, তবু দুই বোনের এই ঐতিহাসিক সংগীতযাত্রা আজ আবার স্মৃতিতে ফিরে আসছে। বলিউডের কিংবদন্তি সুরকার এ আর রাহমান একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আশাজির কণ্ঠ এমন এক জাদু, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’ একইভাবে শিল্পী সোনু নিগম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, তিনি এক সম্পূর্ণ যুগ।’

দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্মজীবনে আশা ভোঁসলে অসংখ্য ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাতেও তাঁর কণ্ঠ সমান জনপ্রিয় ছিল। চলচ্চিত্র, গজল, পপ-প্রতিটি ধারাতেই তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের মনে অম্লান।
পুরষ্কার ও সম্মাননা
পুরস্কার ও সম্মাননাতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে উজ্জ্বল। ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ অর্জনের পাশাপাশি ২০০৮ সালে পান পদ্মভূষণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর স্বীকৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য-১৯৯৭ সালে গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি।
কণ্ঠ, সময়, ইতিহাস -সবকিছুকে পেছনে ফেলে বিদায় নিলেন আশা ভোঁসলে। কিন্তু তাঁর গান, তাঁর সুর, তাঁর কণ্ঠের জাদু থেকে যাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে। ‘শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর শিল্প কখনও হারিয়ে যায় না’ –এই সত্যেরই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইলেন আশা ভোঁসলে।
-তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার
-পতাকানিউজ

