আসন বণ্টন ও বিদ্রোহ ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ২ প্রধান জোটে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। দুই জোট উপরে উপরে ‘জোটবদ্ধ’ দেখালে তলে তলে ‘অতল সাগরেই’ সাতরাচ্ছে। ফলে দুই জোটেই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। কীভাবে স্বস্ত্বিদায়কভাবে নির্বাচনের মাঠ প্রস্তুত করবে তা নিয়ে দুই জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘুম হারাম হচ্ছে।
দুই জোটের গড়বড় সমীকরণ নিয়ে রাজনীতিতে এখন আলোচনা তুঙ্গে। একটি জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বিএনপি। অপরটি গঠিত হয়েছে জামায়াতকে কেন্দ্র করে। তবে নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি এই দুই জোটের ভেতরেই বাড়ছে অস্থিরতা। আসন বণ্টনকে ঘিরে বিভক্তি, সন্দেহ ও অবিশ্বাস এখন জোট রাজনীতির প্রধান সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপিসহ মোট ১১টি দল নিয়ে গড়ে উঠেছে আরেকটি জোট। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই দুই জোটের মধ্যেই। তবে ভোটের লড়াই শুরুর আগেই জোটের ভেতরের টানাপোড়েন সামনে চলে এসেছে।
আসন সমঝোতায় গড়বড় দুই জোটেই
দুটি জোটই শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনা চালালেও বাস্তবে সেটিই এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন দল কতটি আসন পাবে, কোন আসনে কাকে ছাড় দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে তৃণমূল বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এর ফল হিসেবে কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী, কোথাও প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।
চরমোনাই আসন ঘিরে জামায়াত–ইসলামী আন্দোলনের সংঘাত
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে সবচেয়ে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে বরিশাল সদর আসনে। চরমোনাই ইউনিয়ন ইসলামী আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এই আসনে দলটির প্রার্থী হয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
কিন্তু একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। একই জোটের দুই দলের কেউই আসন ছাড়তে রাজি না হওয়ায় সংকট ঘনীভূত হয়েছে।
চরমোনাই পীরের মূল কেন্দ্র এলাকায় জামায়াতের প্রার্থী দেওয়াকে ইসলামী আন্দোলন ভালোভাবে নেয়নি। এ বিষয়ে সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, ‘বরিশাল সদর আসনটি আমাদের মূল ভিত্তি। এখানে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দিয়েছে। একই জোটের দুই প্রার্থী কিভাবে একই আসনে ভোট করবে? এটা তো উচিত নেয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো জামায়াতে ইসলামীর আমির নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী দিইনি। কিন্তু জামায়াত দিয়েছে। বিষয়টি সুন্দর হয়নি।’
সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করতেরও তা আমলে নিচ্ছে না জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, ফয়জুল করীম দুই আসনে প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু তাকে একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তিনি তা রক্ষা করেননি। জামায়াত নেতা মুয়াযযম হোসাইন হেলালের দাবি, এখনো সময় আছে। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যাবে।
নেতারা দ্বন্ধ সমাধানের কথা বললেও বাস্তবে দ্বন্ধ মিটবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে জামায়াত জোটের মধ্যেই।
বিএনপি জোটে বিদ্রোহী প্রার্থীর দাপট
জামায়াত জোটে যখন অস্থিরতা, তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটও সংকটমুক্ত নয়। আসন ছাড় দেওয়ার পরও অনেক জায়গায় বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা জোটের প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে নামছেন না—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এর বড় উদাহরণ পটুয়াখালী-৩ আসন (গলাচিপা ও দশমিনা)। এখানে বিএনপি সরাসরি কোনো প্রার্থী না রেখে জোটের পক্ষ থেকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে তিনি বিএনপির সমর্থন পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ।
নুরুল হক নুর বলেন, এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের “নব্বই শতাংশই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন”।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। পরে তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান দুর্বল হয়নি।
গলাচিপা এলাকায় তার বৈঠকগুলোতে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের পদধারী নেতাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এসব সংগঠনের অনেক কমিটি তার তত্ত্বাবধানে গঠিত হওয়ায় নেতা-কর্মীরা মূলত তার পক্ষেই কাজ করছেন।
হাসান মামুন বলেন, আসনটি যখন জোটকে দিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে সেন্টিমেন্ট জাগ্রত হয়েছে যে এখানে বিএনপির প্রার্থী থাকা উচিত। এখানে বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন, কারণ তারা জানে, এই সিট যদি আমরা গণঅধিকারকে ছেড়ে দেই তাহলে আগামী ত্রিশ বছরেও এই সিট আর বিএনপি পাবে না।
এই পরিস্থিতিতে জোটের প্রার্থী হলেও মাঠে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে অন্য শরিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও।
নুরুল হক নুর বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিলো একটা ভারসাম্যপূর্ণ সংসদের জন্য বিএনপি চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি আসন মিত্রদেরকে ছেড়ে দিতে পারে। যেহেতু খুব অল্প সংখ্যক আসন ছেড়েছে, ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যেও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, এটা ছাইড়া লাভ কি! এটাও আমরা নিয়ে নেই। কারণ এটা শুধু আমার বেলায় নয়, অন্য মিত্রদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
সমাধানের চেষ্টা থাকলেও জট কাটেনি
বিএনপি এখন পর্যন্ত শরিকদের জন্য ১২টি আসন ছেড়েছে। তবে এসব আসনের প্রায় সবগুলোতেই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শরিক দলগুলো পুরোপুরি আশ্বস্ত নয়।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, যারা দাঁড়িয়ে গেছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কিন্তু সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখন এটাকে সন্দেহ করলে সেটা করাই যায়। শরীক দলগুলো কিন্তু ভালো করেই জানে আমাদের চেয়ারম্যান পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এখন শুনছে না। সময় তো এখনো শেষ হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইসলামী আন্দোলন অন্তত একশ’ আসনের কাছাকাছি বণ্টন ছাড়া সমঝোতাকে সম্মানজনক মনে করছে না।
সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, একশত আসন কিংবা এর উপরে বা এর আশেপাশে—এরকম হলে আমি মনে করি বণ্টনটা আমাদের জন্য সম্মানসূচক হয়। একশ’ আসনের কম দেওয়া হলে জোট টিকবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সেটা হবে না কেন? না হওয়ার যুক্তি কী? যদি কারো জন্য এটা না হয়, তাহলে সে দায়-দায়িত্ব তাকেই গ্রহন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে আসন বণ্টনের জটিলতা জোট ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙনের আশঙ্কা না থাকলেও শরিকদের মধ্যে বিএনপির তৃণমূলের ভূমিকা নিয়ে গভীর সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের আগে এই দুই জোট নিজেদের ভেতরের সংকট কীভাবে সামাল দিতে পারে, সেটির ওপরই নির্ভর করবে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
– পতাকানিউজ

