ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিখাতে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা। কারণ, এ চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ ভারতের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, চামড়া ও পাদুকা, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও অলংকার এবং রাসায়নিক পণ্য।
একই সময়ে আসন্ন নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। এলডিসি সুবিধা হারালে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সংকুচিত হবে, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে তৈরি পোশাকশিল্পে। ফলে ইউরোপে সমজাতীয় পণ্যে ভারতের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি এখনই ‘বিপদ সংকেত’ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনার পর গত ২৭ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে নয়াদিল্লিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন–ভারত এফটিএর ঘোষণা দেওয়া হয়। দুই পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্ব এ চুক্তিকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা সব চুক্তির সেরা বলে উল্লেখ করেন। বর্তমানে চুক্তিটি ‘লিগ্যাল স্ক্রাবিং’ বা আইনি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর কার্যকর হতে আরও কিছু সময় লাগবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের এফটিএ বাংলাদেশের জন্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, ভারত শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ, ভারত তুলা, সুতা, কাপড় থেকে শুরু করে মেশিন ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিপরীতে বাংলাদেশকে এসব কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে একই বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপে বাংলাদেশ তিন বছরের ট্রানজিশন সময় পাবে। অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকবে। এই সময়ের মধ্যেই জিএসপি প্লাসের আওতায় শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কারণ, ২০২৭ সাল থেকে ভিয়েতনাম এফটিএর আওতায় ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। তখন একদিকে ভারত, অন্যদিকে ভিয়েতনাম—দুই প্রতিযোগীর সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। এমন বাস্তবতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা এখনো শুরু না হওয়াকে তিনি বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন।

বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপে ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। অন্যদিকে ভারতীয় পোশাক রপ্তানিতে ইউরোপে এখনো ৯ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এফটিএ কার্যকর হলে এই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে।
রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারত–ইইউ চুক্তির প্রভাব প্রশমনে বাংলাদেশকে এখনই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে ভারত তুলা, সুতা ও কাপড় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে ইউরোপের বাজারে তাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প নানা সংকটে পড়েছে। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সংকুচিত হওয়ায় তুলা আমদানি কমছে। এতে তৈরি পোশাকে মূল্য সংযোজন হ্রাস পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধাকে সংকুচিত করবে। এলডিসি উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা মিললেও তার আওতায় তৈরি পোশাক পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে না—এটিও বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে এক হাজার ৭৪৪ কোটি ইউরো, যেখানে ভারতের রপ্তানি ছিল ৪০৯ কোটি ইউরো। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৮৩১ কোটি ইউরো, ভারতের ৪১৮ কোটি ইউরো। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে এক হাজার ৮০৫ কোটি ইউরো, আর ভারত করেছে ৪২৪ কোটি ইউরো।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলারই গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে, যা দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, কানাডায় ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং জাপানে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। এলডিসি উত্তরণের পর যদি এফটিএ বা জিএসপি প্লাসের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তবে ২০২৯ সালের পর ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বিপরীতে ভারত ও ভিয়েতনাম শূন্য শুল্ক সুবিধা ভোগ করবে। তখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ধস ঠেকানো কঠিন হবে।

তিনি বলেন, প্রায় ২০ বছরের আলোচনার পর ভারত ইইউর সঙ্গে এফটিএ করতে পেরেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতিও নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামগুলোতে দক্ষ নেগোসিয়েটরের অভাবও বড় সমস্যা। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই—এমন কর্মকর্তাদের আলোচনায় পাঠানো হয়, যা ফলপ্রসূ হয় না।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক ইউরোপের বাজারে নির্ভরশীল। এ বাজারে যে কোনো হুমকি দেশের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। তিনি মনে করেন, এফটিএ বাস্তবায়নের পর রাতারাতি ভারতের বাজার দখল না বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের সক্ষমতা বাড়বে। ভারতের নিজস্ব তুলা থাকা বড় সুবিধা। অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা হারালে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা আরও কমবে।
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে ইইউর চুক্তির পর এখন সবার টনক নড়েছে। অথচ এটি ২০ বছরের আলোচনার ফল। বাংলাদেশের এখনই দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়ন করা জরুরি—এলডিসি উত্তরণ পেছানো হবে নাকি উত্তরণের পর কীভাবে ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখা যাবে, সে সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হবে।
সূত্র : যুগান্তর
-পতাকানিউজ

