ইউরোপে পৌঁছে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ সেই স্বপ্নকে পরিণত করেছে মর্মান্তিক মৃত্যুযাত্রায়। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হওয়া একটি নৌকা ডুবে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বলে নিশ্চিত করেছে সরকার।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, দুর্ঘটনার পর সরকারের কাছে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পৌঁছেছে। একই ঘটনায় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের গ্রিসের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন, দিরাই উপজেলার চারজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন রয়েছেন। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। এসব কারণে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা এবং একে একে প্রাণ হারান অনেকে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘তারা যেহেতু বৈধ পথে বিদেশে যাননি, তাই আগাম কোনো সরকারি তথ্য ছিল না। এখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করতে, যাতে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, ছোট একটি নৌকায় মোট ৪৩ জনকে তোলা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। পাচারকারীরা প্রথমে বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বললেও শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকাতেই তুলে দেয়। যাত্রাপথে তাদের কোনো জিপিএস বা যোগাযোগের ডিভাইস দেওয়া হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্রে দীর্ঘ সময় ভাসতে থাকায় অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে একপর্যায়ে মৃতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন যাত্রীরা। ওই ব্যক্তি দাবি করেন, এই মানবপাচার চক্রের অনেক সদস্যের বাড়ি সিলেট অঞ্চলে।

প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, দুর্ঘটনার পর গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ মিশন যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহায়তায় জীবিতদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য উপায় খোঁজা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের জীবনকে কোনোভাবেই অর্থ বা সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কেউ স্বেচ্ছায় অবৈধ পথে বিদেশে গেলে সরকারের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।’
উল্লেখ্য, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী তবরুক থেকে নৌকাটি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ধারণা করা হচ্ছে, তবরুকসহ লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেম ঘরে’ এখনো অনেক বাংলাদেশি আটকে থাকতে পারেন।
লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথে
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রাকে দালালরা ‘গেম’ নামে অভিহিত করে। আর যেসব স্থানে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রেখে পরবর্তীতে নৌকায় তোলা হয়, সেগুলো পরিচিত ‘গেম ঘর’ নামে—যেখানে মানবপাচারের ভয়াবহ চক্র সক্রিয় রয়েছে।
দ্যা গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ছয় দিন ভেসে থাকার পর অন্তত ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মানবপাচারের অভিযোগে দুই সন্দেহভাজনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গ্রিসের কর্তৃপক্ষ।
গ্রিক কর্তৃপক্ষের ধারণা, দক্ষিণ সুদানের ওই দুই ব্যক্তি মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারা লিবিয়া থেকে ইউরোপে অভিবাসীদের অবৈধভাবে প্রবেশে সহায়তা করার চেষ্টা করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রস্তুতির জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের খবরে বলা হয়, অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি ইতোমধ্যে ক্রিট দ্বীপের হেরাক্লিয়ন শহরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়েছেন।

গ্রিক পুলিশ জানায়, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর তবরুক থেকে যাত্রা করা নৌকায় থাকা ২৬ জন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও রয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানান, যাত্রাপথে তাদের ২২ জন সহযাত্রীকে ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটি পথ হারিয়ে ফেলায় ভয়াবহ আবহাওয়ার মধ্যে ছয় দিন ধরে সমুদ্রে ভাসতে থাকে। এ সময় খাবার ও পানির মজুত শেষ হয়ে যায়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া যাত্রীদের একপর্যায়ে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
গ্রিক কোস্টগার্ড জানিয়েছে, নৌযানটি ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণে ইয়েরাপেত্রা শহর থেকে প্রায় ৫৩ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটের কারণে চরম ক্লান্তিতে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কোস্টগার্ড আরও জানায়, মৃতদের মরদেহ পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে অবৈধ প্রবেশ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
আরো পড়ুন :
লিবিয়ার উপকূলে নৌকাডুবে ৪ বাংলাদেশি নিহত
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৫৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল ২৮৭ জন।
এর আগে গত ডিসেম্বরেও ক্রিটের দক্ষিণ-পশ্চিমে পানিতে ঢুকে পড়া একটি নৌকা থেকে ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন মাত্র দুইজন জীবিত উদ্ধার হয়েছিল এবং আরও ১৫ জনের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপে অভিবাসন ঠেকাতে সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপের বাইরে তৃতীয় দেশে পাঠানোর ধারণাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিকল্পনাকে অমানবিক বলে সমালোচনা করেছে।
সূত্র : দ্যা গার্ডিয়ান
–পতাকানিউজ

