বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে উচ্চগতিসম্পন্ন নতুন ইঞ্জিন ও কোচ যুক্ত হলেও বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। কাগজে-কলমে ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন আধুনিক ইঞ্জিন যুক্ত হলেও দেশের ট্রেন এখনো গড়ে মাত্র ৫৭ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। পুরোনো ও আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া রোলিং স্টকের ওপর নির্ভরশীলতা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক উন্নয়ন নীতির কারণে রেলব্যবস্থা কার্যত সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিদিন ট্রেন বাতিল, বন্ধ পড়ে থাকা ডজনখানেক রুট এবং বাড়তে থাকা লোকসানের মধ্যে সামনে আসন্ন ঈদুল ফিতরের যাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশে মোট ২৭৫টি ট্রেন চলাচল করছে। কিন্তু এর অন্তত ৭০টি ট্রেন প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল বা কোচ সমস্যার কারণে নিয়মিত চলাচল বজায় রাখতে পারছে না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, রেল ব্যবস্থাকে কার্যকর করার বদলে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার সুফল যাত্রীসেবায় প্রতিফলিত হয়নি।
উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু গতি বাড়েনি
গত ১৬ বছরে রেলওয়েতে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এর প্রায় ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে নতুন রেলপথ নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে। কিন্তু বাস্তবে ট্রেনের সংখ্যা কিংবা গতি—দুটোর কোনোটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। স্বাধীনতার আগে ও পরবর্তী সময়ে দেশে ৪৮৬টি ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭৫টিতে।
বর্তমান ট্রেনগুলোর মধ্যে রয়েছে ১২০টি আন্তঃনগর ট্রেন, ১২৮টি কমিউটার ও মেইল ট্রেন, ৮টি কনটেইনার ট্রেন এবং ১৯টি মালবাহী ট্রেন। পূর্বাঞ্চলে ৩৬টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭টি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মিতালী ও মৈত্রী এক্সপ্রেসসহ মোট ৬টি আন্তঃদেশীয় ট্রেনও বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
ইঞ্জিন-কোচ সংকটে বাতিল ট্রেন, বাড়ছে দুর্ভোগ
রেলওয়ে অপারেশন দপ্তরের নথি অনুযায়ী, শুধু গত জানুয়ারি মাসেই ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে লোকাল, মেইল, কমিউটার ও মালবাহী মিলিয়ে ৫৫৭টি ট্রেন চলাচল বাতিল করতে হয়েছে। একই সময়ে ৭৭৫টি কোচ চলাচলের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে নিয়মিত যাত্রীরা বছরের পর বছর নির্ভরযোগ্য রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টসম্যানসহ জনবল সংকটে দেশের অন্তত ৮৫টি রেলওয়ে স্টেশন বন্ধ রয়েছে। আবার নবনির্মিত গোপালগঞ্জ রেলপথের ৪টি স্টেশনসহ সারা দেশে অন্তত ১৩টি নতুন স্টেশন ব্যবহারই করা হচ্ছে না।
ওয়ার্কশপে সংকট, বাড়ছে অকেজো রোলিং স্টকের স্তূপ
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী জানিয়েছেন, পুরোনো ও আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া ইঞ্জিন-কোচ ঘনঘন বিকল হচ্ছে। ভারী মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে পাঠানো হলেও লোকবল ও যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে সময়মতো মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অকেজো রোলিং স্টকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, সামনে ঈদযাত্রা উপলক্ষে বিশেষ ট্রেন চালানো ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সংকটে দিন-রাত কাজ করেও শঙ্কা কাটছে না। নতুন ইঞ্জিন-কোচ ক্রয়, ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন এবং পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ঈদযাত্রা ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৫ জোড়া ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানো এবং অন্তত ৬৪টি অতিরিক্ত কোচ বিভিন্ন ট্রেনে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতি ঈদেই নতুন ট্রেন চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে চলমান ট্রেন থেকে কোচ খুলে নিয়ে ‘ঈদ স্পেশাল’ চালানো হয়।
তাদের মতে, এতে নিয়মিত ট্রেনের শিডিউল আরও বিপর্যস্ত হয় এবং যাত্রীসেবার মান কমে যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চাপের কারণে চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিন বিকল বা কোচ দেবে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
মালবাহী পরিবহণেও ধস, প্রতিদিন কোটি টাকার লোকসান
রেলের সংকট শুধু যাত্রী পরিবহণেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে মালবাহী ট্রেন চলাচলও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কনটেইনার পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালে প্রায় দেড় হাজার কনটেইনার পড়ে আছে। যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন বাতিলের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি টাকা লোকসান গুনছে রেলওয়ে।
গত অর্থবছরে রেলের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮শ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই লোকসান আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও রোলিং স্টক কেনা হয়নি
রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তরের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দুটি বড় রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও যেখানে ১৫০টি ট্রেন চলার কথা ছিল, বর্তমানে চলছে মাত্র ৮টি ট্রেন।
পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোর মোট ব্যয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ রোলিং স্টক ক্রয়ে ব্যয় করা হলে রেলবহরে ৫০০ ইঞ্জিন ও ৫ হাজারের বেশি কোচ যুক্ত হতে পারত। এতে বর্তমানে চালু ট্রেনের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৮২৫টিতে উন্নীত করা সম্ভব হতো।
একটি ইঞ্জিন কিনতে ১৯ থেকে ২৩ কোটি টাকা এবং একটি কোচ কিনতে দেড় থেকে সোয়া ২ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। অথচ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ থাকায় ইঞ্জিন-কোচ ক্রয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন ইঞ্জিনও অচল, দুর্নীতির অভিযোগ
গত ১৬ বছরে ৭০টি নতুন ইঞ্জিন কেনা হয়েছে এবং ভারত অনুদান হিসেবে দিয়েছে আরও ৩০টি ইঞ্জিন। এর মধ্যে ৩২০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার ৩০টি আধুনিক আমেরিকান ইঞ্জিন দেশে আনার পর থেকেই একের পর এক বিকল হতে থাকে। বর্তমানে এসবের মধ্যে ২০টি ইঞ্জিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে এবং চালু থাকা ১০টিও মাঝেমধ্যে চলন্ত অবস্থায় বিকল হয়ে পড়ছে।
ইঞ্জিন ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে রেলের সাবেক মহাপরিচালক সামসুজ্জামানসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করেছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ইঞ্জিন ও কোচ সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যত্রতত্র রোলিং স্টক বিকল হওয়ায় ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে, এতে যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে রেল।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. এম সামছুল হক বলেন, রেলে যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। অপরিকল্পিত প্রকল্প ও দুর্নীতির কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। রেলকে টেকসই করতে হলে চলমান রেলপথ সচল রাখা, ট্রেনের গতি বৃদ্ধি এবং জরুরি ভিত্তিতে ইঞ্জিন-কোচ ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে।
তার মতে, রেল খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়লেও যাত্রীসেবা উন্নত হবে না।
সংকটের মুখে ভবিষ্যৎ
সব মিলিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি—অবকাঠামো আছে, কিন্তু চালানোর মতো পর্যাপ্ত ইঞ্জিন-কোচ নেই; নতুন প্রকল্প আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য সেবা নেই। সামনে ঈদযাত্রার চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রোলিং স্টক বৃদ্ধি, ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন এবং জনবল সংকট দূর না করলে রেলের গতি বাড়ানো তো দূরের কথা, বিদ্যমান সেবাও টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র : যুগান্তর
-পতাকানিউজ

