টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশ নেই। কলকাতার ইডেন গার্ডেনে হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ। অথচ টুর্নামেন্ট শুরু হয়ে গেল বাংলাদেশকে ছাড়াই। সেই শূন্যতা পূরণ করতে আইসিসির আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মাঠে হাজির স্কটল্যান্ড। ক্রিকেট মাঠে যখন রাজনীতির অনধিকার প্রবেশ ঘটে, তখন দৃশ্যপট ঠিক এমনই হয়ে ওঠে—ইডেন গার্ডেন যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ হয়ে দাঁড়াল।
মাঠের ফাঁকা আসনগুলো যেন নীরবে বলে দিচ্ছিল, ক্রিকেট আর রাজনীতি এক নয়। যারা রাজনীতি করেন, তারা রাজনীতির মাঠেই খেলুন—ক্রিকেটের মাঠে নয়। রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেটে ঢুকলে তার পরিণতি যে এমন হতে পারে, ইডেনের নীরব গ্যালারিই যেন সেই সতর্কবার্তা দিয়ে গেল।
ভাবুন তো, ক্রিকেট মাঠ, ব্যাট আর বলের যদি কথা বলার ক্ষমতা থাকত, হয়তো তারাও এভাবেই জবাব দিত রাজনীতির অনুপ্রবেশকে। কিন্তু তারা তো নির্বাক। তাই প্রকাশ্যে কিছু বলা হয়নি, তবু বাস্তবে ফাঁকা গ্যালারিই যেন শাসক ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে ক্রিকেটের নীরব প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে। বধির রাজনীতির কর্ণকুহরে সেই প্রতিবাদ পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকতেই পারে। তবু ক্রিকেট নিজের মতো করেই প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিয়েছে।
ঘটনার শুরুটা বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরেই। কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে পারলে আইপিএল থেকে প্রায় ৯ কোটি টাকা আয় করার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠন এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চাপের মুখে মোস্তাফিজকে কার্যত আইপিএল থেকে ছিটকে যেতে হয়—এটাই মূল অভিযোগ ক্রিকেটপাড়ার।
এরপরের ঘটনাপ্রবাহ তো এখন সবারই জানা। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর দিনেই সেই ক্রিকেটীয় প্রতিবাদের প্রতিফলন দেখেছেন অনেকেই।
ইডেনের গ্যালারি বাংলাদেশি দর্শকে টইটম্বুর হতো না নিশ্চিত। কিন্তু ভারতীয় দর্শকরাই তো এমন আয়োজন উপভোগ করার কথা। সেই দর্শক না থাকায় আর্থিক ক্ষতির হিসাবও নাকি ছোট নয়। এক মোস্তাফিজের সম্ভাব্য ৯ কোটি টাকার আয় ঠেকাতে গিয়ে আইসিসি প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে—এমন কথাও ঘুরছে ক্রিকেটের অন্দরমহলে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে রাজি করানোর জন্য আইসিসি ‘ভাতের মোছা’ এবং ‘লাঠি’ দুটোই প্রস্তুত করেছে। একদিকে কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে নানা প্রলোভন—দুটোই সামনে রেখেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। পাকিস্তান যদি ভারতের সঙ্গে ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে কী পরিণতি হতে পারে, সেটিও নাকি তাদের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

উপমহাদেশের তিন দেশ—ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—ক্রিকেটে কেন এমন অক্রিকেটীয় অবস্থানের দিকে যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন আর শুধু এই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও বিষয়টি নিয়ে সরব। তাদের অনেকের মতে, এই সংকটের পেছনে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাই বড় কারণ। যদিও এসব সমালোচনার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করছে না আইসিসি। ফলে ক্রিকেট প্রশাসনে ভারতীয় প্রভাবের অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে।
জয় শাহ’র ‘অক্রিকেটীয়’ রাজনীতি
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ আইসিসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেকের মতে, আইসিসি এখন কার্যত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পাকিস্তানে খেলতে ভারতের নিরাপত্তাজনিত আপত্তির কারণে ম্যাচ দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও সেই অভিযোগকে শক্তিশালী করেছে।
নাসের হুসেইনের কড়া প্রশ্ন
এই প্রেক্ষাপটে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার নাসের হুসেইন সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। স্কাই ক্রিকেট পডকাস্টে তিনি বলেন, উপমহাদেশের ক্রিকেটে রাজনীতি আর খেলার সীমারেখা বহু আগেই মুছে গেছে। মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে এখন বোর্ডরুমের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা আর ক্ষমতার রাজনীতিই বড় হয়ে উঠছে। তার মতে, ক্রিকেট এখন এই অঞ্চলের অন্যতম কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার, আর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বারবার তার শিকার হচ্ছে।

ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও আসে—এ কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন নাসের। তার মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রিকেট ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারত-পাকিস্তান কিংবা ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও একসময় ভারসাম্য হারাবে।
নাসেরের প্রশ্ন ছিল আরও সরাসরি। যদি উল্টো পরিস্থিতি হতো? যদি কোনো টুর্নামেন্টের ঠিক আগে ভারত সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে দলকে সরিয়ে নিতে চাইত, তাহলে কি আইসিসি একইভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারত? তার এই প্রশ্নই যেন ক্রিকেট প্রশাসনের নৈতিক অবস্থানকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নাসের হুসেইন স্পষ্টভাবে সহানুভূতিশীল। তার মতে, বাংলাদেশ হঠাৎ করে নিরাপত্তা ইস্যু তোলে নি। পুরো সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল মোস্তাফিজকে ঘিরেই। বিসিবি যেভাবে নিজেদের ক্রিকেটারের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেটিকে তিনি প্রশংসনীয় বলে মনে করেন। একইভাবে পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের যে অবস্থান নিয়েছে, সেটিকেও তিনি সাহসী ও নৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
নাসেরের মতে, পাকিস্তানের সামনে হয়তো অন্য কোনো পথও খোলা ছিল না। কোনো এক সময় তো কাউকে বলতে হবেই—রাজনীতি অনেক হয়েছে, এবার ক্রিকেটে ফেরা দরকার। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটে রাজনীতির ছায়া অবশ্য নতুন নয়। এশিয়া কাপে ট্রফি গ্রহণে অস্বীকৃতি, ম্যাচ শেষে হাত না মেলানোর মতো ঘটনাগুলো বহুবার ক্রিকেটের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আগে এসব ছিল ব্যতিক্রম, এখন যেন নিয়ম হয়ে উঠছে। একসময় ক্রিকেট দেশ ও জাতিকে এক করত, এখন উল্টো বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তাই নাসের হুসেইনের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে যদি এভাবে কোণঠাসা করা হয়, তাহলে তাদের ক্রিকেট দুর্বল হয়ে পড়বে। আর উপমহাদেশের ঐতিহাসিক ক্রিকেট লড়াইগুলো যদি প্রতিযোগিতার ভারসাম্য হারায়, শেষ পর্যন্ত তার দায় পড়বে আইসিসির কাঁধেই। ক্রিকেট তখন হয়তো থাকবে, কিন্তু ক্রিকেটের আত্মাটা কোথাও হারিয়ে যাবে—ইডেন গার্ডেনের ফাঁকা গ্যালারির মতোই নিঃশব্দ হয়ে যাবে ক্রিকেট!
সূত্র : স্কাই স্পোটর্স পডকাস্ট
-পতাকানিউজ/এসএমআর

