আজ ৫ আগস্ট। এক বছর আগে এই দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে, অবসান হয় টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের। দীর্ঘদিন নির্বাচনী অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষ, দমন-পীড়নের শিকার নাগরিক সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে এই দিনে।
এই দিনটিকে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়েছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে। দিনটি পালন করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সেইসাথে জুলাই আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোও পালন করছে এই ঐতিহাসিক দিনটিকে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান
জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। শুরুটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেও এটি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সরকারের দমন-পীড়ন, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ জনগণ একাত্মতা প্রকাশ করে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে। সরকারের নির্যাতন যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তখন আর কেউ আন্দোলন থামাতে পারেনি। চূড়ান্ত রূপ নেয় ৫ আগস্টের গণভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাধ্য হন পালিয়ে যেতে।
আদালত বনাম ছাত্র আন্দোলন
২০১৮ সালে সরকার কোটা বাতিলের পরিপত্র জারি করলেও, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কোটা সংরক্ষণে দায়েরকৃত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ৫ জুন কোটা বাতিল করে পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় স্থগিত না করে ‘স্থিতি অবস্থা’ বজায় রাখেন।
ছাত্ররা দাবি তোলে, আদালতের রায়ে নয়, নির্বাহী আদেশেই কোটা প্রথা বাতিল করতে হবে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। আন্দোলনে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করে।
‘বাংলা ব্লকেড’ এবং উত্তাল রাজপথ
২০২৪ সালের ৭ জুলাই ছাত্ররা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। ফলে রাজধানী ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ ‘স্থিতি অবস্থা’ বজায় রাখলেও ছাত্ররা রাজপথ ছাড়েনি। ১১ জুলাই ব্যারিকেড ভেঙে তারা আন্দোলন চালিয়ে যায়। ১৪ জুলাই এক সরকারি মন্ত্রী ছাত্র আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বংশধর’ বলে অভিহিত করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্লোগান উঠে—‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার!’ সারা দেশের ছাত্র সমাজ মিছিলে মুখর হয়ে ওঠে।
ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য ও গুলি চালনার ঘটনা
১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেন, ‘এই আন্দোলনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’, যার পরপরই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো মাঠে নামে আন্দোলন দমনে। ফলে সহিংসতা বাড়ে। ১৬ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ চলাকালে ঢাকায় ২ জন, চট্টগ্রামে ৩ জন এবং রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা। এরপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৮ জুলাই ছাত্ররা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।
সান্ধ্য আইন, কারফিউ এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা
১৯ জুলাই থেকে রাত ১২টা থেকে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করা হয়। তার আগেই ১৭ ও ১৮ জুলাই গুলিতে নিহত হন ৫৩ জন আন্দোলনকারী। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট। ২১ থেকে ২৩ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেও আন্দোলন থামানো যায়নি। ২২ জুলাই আপিল বিভাগ কোটা রক্ষায় রায় দেন। সংরক্ষিত ৭% কোটা রাখা হয়—মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও উপজাতিদের জন্য। সরকার নতুন পরিপত্র জারি করে।
শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় চলবে। ছাত্ররা ২ আগস্ট থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এতে সরকারপন্থী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। দাবি ওঠে ছয়জন মন্ত্রীর পদত্যাগের। শেখ হাসিনা বরং দমন-পীড়ন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
৪ আগস্ট: দেশজুড়ে রণক্ষেত্র
৪ আগস্ট সংঘর্ষ চূড়ান্ত রূপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনারে অবস্থান নেয় ছাত্র জনতা। ঘোষণা আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয় সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর বল প্রয়োগ করবে না। এতে উৎসাহিত হয়ে ছাত্র জনতা ৫ আগস্টেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ এগিয়ে আনে।
রাতভর অবস্থানের পর ৫ আগস্ট সকালে রাজধানী ঢাকার অলিগলি দখলে নেয় ছাত্র জনতা। দুপুরের আগেই তারা গণভবনের দিকে অগ্রসর হয় এবং প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। শেখ হাসিনা এর আগেই হেলিকপ্টারে পালিয়ে যান।
সেদিন বিকেলে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন এবং নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এভাবেই পতন ঘটে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এক ফ্যাসিবাদী সরকারের।
মামলা ও বিচারের মুখে শেখ হাসিনা
৫ আগস্টের পরদিন থেকেই শুরু হয় মামলা দায়ের। মোহাম্মদপুরের মুদি দোকানি আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয়। একে একে দেশের বিভিন্ন থানায়, আদালতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪০০-র বেশি মামলা হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।
মামলাগুলোর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে— গুম ও হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতিতে প্লট বরাদ্দ। শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মিডিয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়।
নিম্ন আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বহু মামলার তদন্ত চলছে। ১৮টি মামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারযোগ্য করা হয়েছে, যার মধ্যে চারটি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলা
রংপুরের আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ মামলার বিচার শিগগিরই শুরু হবে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোন সরকার প্রধান দেশ থেকে পালানোর ঘটনা ঘটলো। দেশে ছাত্রদের আন্দোলনে কোন সরকার প্রধান পদত্যাগ করার ঘটনাও এই প্রথম।
এই প্রথম ছাত্রদের আন্দোলনে মানুষ রাষ্ট্র সংস্কারের আশায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আর কোন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টের জন্ম হবে না আশায় বুক বেঁধেছে সাধারণ মানুষ। এই কারণেই ৫ আগস্ট ইতিহাসের নতুন মোড়ে রূপ নেয়।
পতাকানিউজ/কেএস

