ইয়াবা পাচারের সময় কক্সবাজারের টেকনাফে অভিযান চালালো র্যাব। ৬০ হাজার ইয়াবাসহ দুজন আসামিকে গ্রেপ্তারের পর মামলা হলো। মামলা হলো থানায়। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র উত্থাপিত হলো বিচারিক আদালতে। সেই আদালত থেকে সমন পেয়ে সাক্ষী দিতে কাটগড়ায় দাড়াঁলেন বাদী। তারপর সত্য বলার শপথ নিয়ে বাদী দাবি করলেন, ‘আমি এই মামলা করিনি, মামলার এজহারে নাম থাকলেও স্বাক্ষর আমার নয়।’
-বিস্ময়কর এমন সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার আদালতে। গত ৩১ মার্চ আদালতে দাঁড়িয়ে বাদীর এমন সাক্ষ্যে আদালত পাড়ায় বিস্ময়ের সঙ্গে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাদী যদি মামলা না করেন তাহলে এই মামলা রেকর্ড ও তদন্ত হলো কী করে? পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কার মামলা তদারকি করেছিলেন তদন্ত পর্যায়ে। আর আসামিরা কারাগারে গেলেন কিভাবে? অভিযানের পুরো বিষয়টিই বা কিভাবে ঘটেছিল?
এতো সব প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে বাদীর একটি মাত্র বক্তব্যের পর। কারণ, বাদী বলছেন তিনি স্বাক্ষরই করেননি। মামলার বাদীও নন। অথচ এই বাদী একজন সরকারি কর্মজীবী। ঘটনার সময় তিনি কক্সবাজারে র্যাবে কর্মরত থাকলেও বর্তমানে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় ৯ বিজিবিতে সুবেদার পদে কর্মরত রয়েছেন।
কী ঘটেছিল সেই সময়
আদালত থেকে পাওয়া তথ্য এবং মামলার নথির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি এলাকায় র্যাব-১৫-এর একটি দল অভিযান চালিয়ে দুইজনকে আটক করে। তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়।
অভিযানের পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর র্যাবের ওই সময়ের ডিএডি মো. ফিরোজ আহামেদ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দুইজনকে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পলাতক আসামি দেখানো হয়।
অভিযোগটি তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ এবং পরিদর্শক ওসি (তদন্ত) নাছির উদ্দিন মুজমদার যৌথ স্বাক্ষরে মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়। (টেকনাফ থানা মামলা নম্বর : ২৩/২০২৩ ইংরেজি এবং জিআর মামলা নম্বর : ৬৪১/২০২৩)
ইয়াবা মামলাটি তদন্তের জন্য অফিসার ইনচার্জ দায়িত্ব দেন ওই সময়ে টেকনাফ থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ গোলাম হক্কানীকে। তদন্ত শেষে গোলাম হাক্কানী ১৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযানের সময় গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামির সঙ্গে তদন্তপর্যায়ে প্রাপ্ত আরো তিনজনকে দোষী উল্লেখ করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
এরপর ২০২৫ সালের ৬ মে আদালতে মামলাটি অভিযোগ গঠন এবং বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়। বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে প্রথমে বাদীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে তলব করা হয়।

এবার বাদীর ‘বিস্ফোরক’ দাবি
২৯ মে আদালতে সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়ে বাদী দাবি করলেন, তিনি মামলার বাদী নন। সাক্ষর তার নয়। বাদীর এমন সাক্ষ্য নিয়েই আদালত পাড়ায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। কারণ, বাদীর স্বাক্ষর ছাড়া মামলা রেকর্ড হওয়ার কথা নয়। আবার দীর্ঘ তদন্তপর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা অবশ্যই বাদীকে শনাক্ত করার কথা। তখন কেন বিষয়টি ধরা পড়েনি কিংবা বাদী কি এখন আদালতে অসত্য বলছেন? –সব ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হলেও এখনো পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর মিলেনি।
বাদীর এমন চাঞ্চল্যকর দাবির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের এজলাসে। সেখানেই ওইদিন সাক্ষ্য দেন র্যাব-১৫-এর সাবেক কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আহামেদ।
বাদীর এমন দাবির বিষয়টি পতাকানিউজকে নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, বাদীর এ বক্তব্যে আদালত কক্ষজুড়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম পুরো ঘটনার রহস্য উদঘাটনে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, সমন পেয়ে মামলার এজাহার দায়েরকারী বাদী কক্সবাজারস্থ র্যাব-১৫-এর সাবেক কর্মকর্তা ফিরোজ গত ৩১ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে উপস্থিত হন। তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে শপথ গ্রহণ করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে বলেন, তিনি এ মামলার নন। এই মামলা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানি না, এজাহারকারী হিসেবে তার থাকলেও এজাহারের নিচে থাকা স্বাক্ষর তার নয়। একইভাবে মামলার আসামিদের তিনি চিনেন বলে আদালতকে জানান।
আদালতে বক্তব্য দেওয়ার পর বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদ তার বক্তব্য স্বহস্তে লিখে হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করেন। হলফনামায় বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদের নমুনা স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। হলফনামাটি একই আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট তারেক আজিজ সত্যায়িত করেন।
বাদী যখন আদালতে এমন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন ওই মামলার আসামি আসামি মো. আব্দুল্লাহ ও মো. আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় আসামিদের মুখে হাসি দেখা গেছে। কারণ, বাদী যদি মামলার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তাহলে মামলার দায় থেকে তারা খালাস পেতে পারেন-এমন আশা আসামীদের।
বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর বিচারক আদেশে বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় এজাহারকারী সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়া একটি মারাত্মক ত্রুটি। মামলাটি কীভাবে দায়ের হলো, কারা এজাহার করেছে, স্বাক্ষর জাল কিনা, তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা—এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।

বিচারক আরও উল্লেখ করেন, প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে কিনা বা নিরীহ কাউকে ফাঁসানো হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নন -এমন একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। একইসঙ্গে আদেশের কপি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য শুনে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মান্নান পতাকানিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই বিস্ময়কর। একটি বাহিনীর পক্ষে মামলার এজহার দাখিল, পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরে মামরা রেকর্ড এবং তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর এমন প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত পর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বাদীকে শণাক্ত করার কথা। আর এখন যদি বাদী আদালতে অস্বীকার করেন তাহলে বুঝতে হবে মামলাটি দায়েরের সময় জালিয়াতি হয়েছে। এক্ষেত্রে মামলা লিপিবদ্ধ করার সময় থানার ওসি সহ সংশ্লিষ্টরা যাচাই-বাছাই না করে অপরাধ করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে বাদীকে শনাক্ত না করে আরও একটি অপরাধ করেছেন। তাই সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
মামলা রেকর্ড এবং তদন্ত পর্যায়ে বাদীকে শনাক্ত না করার বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হয় টেকনাফ থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ এবং মামলা রেকর্ডকারী পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দকে। কিন্তু অপরপ্রান্ত থেকে তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একইভাবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ গোলাম হক্কানী বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় কর্মরত নেই। ফলে তার বক্তব্য জানাও সম্ভব হয়নি।
-পতাকানিউজ/এনএ

