যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের ধাঁধায় ফেলে ‘হাবুডুবু’ খাওয়ানো যেন এক রীতিতে পরিণত করেছে ইরান। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার থেকে শুরু করে রোনাল্ড রিগ্যান কিংবা বিল ক্লিনটন-সবাই এই ধাঁধায় পড়েছেন। এখন যেমন পড়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
-এই বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে। তাঁর এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের নেতাদের আচরণ বুঝতে না পারারই একটি নতুন লক্ষণ।
অথচ, ট্রাম্প নিজেই দাবি করেন তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা বুঝেন এবং সেই দুর্বলতা কাজে লাগানোর কারিগর। এই কারিগরকেই এখন পুরোপুরি ধাঁধায় ফেলেছে ইরান।
ধাঁধায় পড়ে ট্রাম্প গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘তাঁরা (ইরান) আমার ক্ষোভই বাড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধুই আমাকে রাগাচ্ছেন।’
নিউইয়র্ক টাইমস মনে করে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সামনে হয়তো আরও বড় হতাশা অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি খুব কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে শুল্ক আদায়ের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অনড় ইরান।
সবমিলিয়ে ট্রাম্প যে এখন জলে হাবুডুবু খাচ্ছেন-সেটা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি যুদ্ধ সামাল দিয়ে ‘সম্মানের’ সঙ্গে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন- বলে যে প্রচারণা চলছে সেটাও ঠিক মতো পারছেন না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এখন বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে একটি সুবিধাজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। বিশেষ করে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত ভোটারদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান দ্বন্দ্ব বিশ্ববাজারে তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর মাশুল দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোক্তাদের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিকেও।
তবে ইরানকে বুঝতে গিয়ে সংকটে পড়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন ট্রাম্প। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের জটিল শাসনকাঠামো এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন। কেউ কেউ এর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কাও খেয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তাঁর করা পরমাণু চুক্তিটি ছিল দীর্ঘ ২০ মাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। রিপাবলিকান এবং কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য অবশ্য অভিযোগ করেছিলেন, ইরান ‘উদারতার ভান’ করে ওবামাকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তিতে প্রলুব্ধ করেছে। তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও ওবামা চুক্তিটিকে তাঁর বড় অর্জনগুলোর একটি বলে মনে করতেন।
সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।
কয়েক দশক ধরে ইরান নিয়ে গবেষণা করা পোলাক বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের হতাশার এক চরম প্রতীক হলেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন, আরেকদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু দেখলেন, কোনো পথেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।’
শক্তি প্রয়োগেও আসেনি কাঙ্ক্ষিত ফল
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে কথা বলেন, যেন ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করলেই দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় প্রায় ৪০ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
এর পরপরই ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান ট্রাম্প। তিনি এমনকি বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা তিনিই ‘বেছে দেবেন’।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। কিন্তু ট্রাম্পের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশটিতে কোনো গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। উল্টো ইরানের কট্টরপন্থী সরকার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
গত মার্চে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা তাঁর বাবার চেয়েও বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক বোমা অর্জনের ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহী।
মোজতবাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে ট্রাম্প জনসমক্ষে ঘোষণা দিলেও ইরান তাতে পাত্তা দেয়নি। এমনকি সশরীর বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া প্রকাশ্য প্রস্তাবেরও কোনো জবাব দেননি নতুন সর্বোচ্চ নেতা।
তারপরও ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা ছাড়েননি ট্রাম্প। গত এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি একটি চুক্তি করে, তবে তারা নিজেদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।’ তাঁর মতে, চুক্তি করলে ইরান ‘একটি বৈধ দেশে পরিণত হতে পারে, মৃত্যু আর আতঙ্কের কোনো দেশ হিসেবে নয়।’
ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, হরমুজ প্রণালি এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয় নিয়ে তাঁরা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্পের মূল দাবিগুলোর একটি বড় অংশ শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছেন তাঁরা।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই ভালো বোঝেন’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশটির কোনো নেতাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী নন। মাসের পর মাস ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেনদেন চললেও দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি এখনো স্পষ্ট ধারণা পাননি বলেই মনে হয়।
চলমান সংঘাতের পুরো সময় ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও তাঁর প্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নিজের অবস্থান বারবার বদলেছেন ট্রাম্প। কখনো তাঁদের ‘পাগল’, কখনো ‘যৌক্তিক’, কখনো ‘উন্মাদ স্বভাবের’, ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ কিংবা ‘একেবারেই উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরানের সঙ্গে বড় চুক্তির আশায় ট্রাম্পের পূর্বসূরি কয়েকজন প্রেসিডেন্টও একই ধরনের হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে ক্রমাগত অবমূল্যায়ন করে এসেছেন।’
এই ব্যর্থতার একটি বড় কারণ হলো, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সশরীর সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি।
সুজান ম্যালোনির মতে, চলমান যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটিতে এই মুহূর্তে বিকল্প কোনো শক্তিশালী ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে ওঠার পথও রুদ্ধ হয়েছে।
ইরানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও সবকিছু মূলত সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন পরিচালিত হয়। অতীতে এ ব্যবস্থার মধ্যেই কখনো কখনো এমন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উত্থান ঘটেছে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ওয়াশিংটন তাঁদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব প্রচেষ্টার পরিণতি হয়েছে অনুশোচনা ও ব্যর্থতা।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান-দুই দলের প্রেসিডেন্টদের অধীনেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে দীর্ঘকাল কাজ করা প্রবীণ মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই হয়তো অনেক ভালো বোঝেন।’
কার্টারের ‘তীব্র হতাশা’
ইরানকে বুঝতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হোঁচট খাওয়ার ইতিহাস শুরু হয়েছিল ইসলামি বিপ্লবের পরপরই। ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানের মার্কিন দূতাবাস থেকে আগের বছর জিম্মি হওয়া ৫২ মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন আলোচনার অনুমোদন দেন।
কার্টারের ডায়েরি থেকে জানা যায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো তিনিও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার কোন্দলের খুঁটিনাটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন।
১৯৮০ সালের শুরুর দিকে কার্টার ভেবেছিলেন, জিম্মিদের মুক্ত করার বিষয়ে তিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের অবরুদ্ধ শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করবে না-এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কার্টারের ভাষায়, শেষ পর্যন্ত সেটি ছিল এক ‘তীব্র হতাশা’।
কারণ ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্রস্তাবটি এক ঝটকায় নাকচ করে দেন। তাঁর আকস্মিক সিদ্ধান্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নিজের অধীনস্থদেরও পুরোপুরি অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিল।
পরে কার্টার জিম্মিদের উদ্ধারে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। সেটিও ব্যর্থ হয়। অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কার্টারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ দিনে একটি চুক্তির মাধ্যমে জিম্মি মার্কিনরা মুক্তি পান।

গোপন অস্ত্রচুক্তি ও রিগ্যানের বিপর্যয়
এর পাঁচ বছর পর, ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর সহযোগীদের একজন ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ীর পাঠানো বার্তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
বার্তায় দাবি করা হয়েছিল, খোমেনি মারা যাওয়ার পর ইরানের কিছু মধ্যপন্থী কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতে পারেন। রিগ্যান পরে এটিকে একটি ‘কৌশলগত সুযোগের সন্ধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিনদের মুক্তির বিনিময়ে ইরানের কাছে গোপনে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন তিনি। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি পরে ইতিহাসে কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
কারণ, মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে অস্ত্র বিক্রির অর্থ গোপনে নিকারাগুয়ার কমিউনিস্টবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর তহবিলে পাঠানো হয়েছিল।
গোপন লেনদেনটি প্রকাশ্যে আসার পর রিগ্যানের প্রেসিডেন্সি বড় ধরনের কেলেঙ্কারির মুখে পড়ে। ঘটনার জেরে কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং রিগ্যানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মরীচিকাই প্রমাণিত হয়। তেহরানে কোনো মধ্যপন্থী নেতার দেখা পাওয়া যায়নি। পরে সিআইএ জানতে পারে, পুরো প্রক্রিয়ার ‘হোতা’ সেই ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ী আসলে একজন ‘প্রতারক’ ছিলেন।
ঘটনার প্রধান বিষয়গুলো নিজের অজানা ছিল দাবি করে রিগ্যান পরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ক্ষমা চান। তবে ইরানি মধ্যপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মূল লক্ষ্যটির পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন তিনি।
ক্লিনটনের সামনে এসেছিল নতুন সুযোগ
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরেকটি বাস্তব সুযোগ আসে। সে বছর ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
খাতামি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এমনকি মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দুঃখও প্রকাশ করেন। এটিকে প্রকৃত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছিল।
জবাবে ক্লিনটনও ইরানের পেস্তা ও কার্পেট আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াসহ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে ইরানের পুরোনো কিছু ক্ষোভ ও অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করে সমঝোতামূলক বক্তব্য দেন।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট ১৯৫৩ সালে ইরানের সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএর সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, যিনি দেশটির পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত তেলশিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন।
কিন্তু ইরানের শক্তিশালী কট্টরপন্থীরা প্রেসিডেন্ট খাতামির উদার দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে তাঁদের পশ্চিমাবিরোধী আদর্শের মূল ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়তে পারত।
অলব্রাইটের বক্তব্যের কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা কার্যত উড়িয়ে দেন।
ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট খাতামি পরে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন, খামেনি বিশ্বাস করতেন-ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না।
ওবামার চুক্তি, ট্রাম্পের প্রত্যাহার
ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন কেবল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
ওবামা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশা করেছিলেন, আরেক মধ্যপন্থী ইরানি নেতা হাসান রুহানির সঙ্গে করা ওই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হয়ে উঠবে। কিন্তু সেটি আর হয়নি।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তিতে অনুমোদন দিলেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি।
ওবামার সমালোচকেরা তখন বলেছিলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির এই আচরণই প্রমাণ করে যে রুহানির ওপর ভরসা করা আর অতীতে খাতামির ওপর ভরসা করা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না-ইরানের দীর্ঘদিনের সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয় ২০১৮ সালে। প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ করেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং চুক্তির আগের তুলনায় আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেন। জবাবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।
যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে ইরান
পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত দুই দেশকে গত বছর সহিংস সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। এর চূড়ান্ত রূপ হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, এরপর থেকেই ইরান কূটনীতিতে ওয়াশিংটনকে প্রতিনিয়ত টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের স্পষ্ট অধৈর্য মনোভাব তেহরানের কৌশলকে আরও সহজ করে দিয়েছে।
রস বলেন, ‘আমাদের তাড়াহুড়াকে তারা একধরনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা সব সময় সবকিছু দ্রুত শেষ করতে চাই। আর তারা এ নীতিতে কাজ করে যে-সময় আমাদের চেয়ে তাদের স্বার্থকেই বেশি রক্ষা করবে।’
ট্রাম্প অবশ্য ইরানের শুল্কসংক্রান্ত দাবিকে আগেই অগ্রহণযোগ্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে নিজের পছন্দমতো একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারার খেসারত তাঁকে এখন রাজনৈতিকভাবেও দিতে হচ্ছে।
আর ইতিহাস বলছে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই হতাশা শুধু ট্রাম্পের নয়। কার্টার থেকে রিগ্যান, ক্লিনটন থেকে ওবামা-প্রায় প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনো সময়ে তেহরানের রাজনৈতিক কাঠামো, নেতৃত্ব এবং কৌশল বুঝতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন।
পার্থক্য শুধু এটুকু-কেউ কূটনীতির মাধ্যমে, কেউ অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে, আবার কেউ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সেই জট খুলতে চেয়েছেন। কিন্তু চার দশকের বেশি সময় পরও ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সেই পুরোনো ধাঁধার স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
-তথ্যসূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস
-পতাকানিউজ

