ইরানের এক ঘোষণাতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে অন্তত ১০ ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ক্ষণে ক্ষণে নিজের সোশাল মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছেন। একটি বার্তার সঙ্গে অন্যটির তেমন সামঞ্জ্য থাকছে না। কখনো হুমকি কিংবা কখনো চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছেন দাবি করে ‘বিজয়’ দাবি। সবমিলিয়ে শুক্রবার দিনটি গেছে নাটকীয় সব ঘটনায়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ঘিরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পর্দার আড়ালের উত্তোজনা এবং আলোচনায় থাকা হরমুজ প্রণালি নিয়ে শুক্রবার দিনভর নাটকীয় ঘটনা দেখেছে বিশ্ব। তবে এসব খবরের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। তেলের দাম কমেছে ১০ ডলার। আর হরমুজ চালু থাকবে ১০ দিন ঘোষণার পর স্বত্ত্বি ফিরেছে। অবশ্য, এসব আলোচনার চূড়ান্ত রূপ এখনো প্রত্যক্ষ করেনি বিশ্ববাসী।
টানা ৪০ দিনের যুদ্ধ এবং চরম উৎকণ্ঠার পর একদিকে ইরানের আশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রের কখনো হুমকি, কখনো আলোচনার ইঙ্গিত -সব মিলিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবারও বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রণালিটি উন্মুক্ত রাখার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের পতন নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
প্রথমে আসে ইরানের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, লেবাননে চলমান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা এবং রয়টার্সে প্রকাশিত একাধিক সংবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। যুদ্ধবিরতির সময় নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ-এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি তৈরি করে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌঁছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ অতিক্রম করে এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই জলপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকে। জাহাজ চলাচলে কড়াকড়ি, সামরিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের খবর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি করে। অনেক জাহাজ বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা শুরু করে, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামেও।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি দাবি করেন, ইরান ভবিষ্যতে আর কখনোই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক বার্তায় তিনি এই সমঝোতাকে ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি একটি উজ্জ্বল দিন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে আসে, যখন প্রণালিতে সামরিক উপস্থিতি ও বিধিনিষেধের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে তাঁর ঘোষণাকে অনেকেই পর্দার অন্তরালের দীর্ঘ আলোচনার ফল হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, এই জলপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য স্থায়ীভাবে নিরাপদ থাকবে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। ইরান প্রণালি উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল থাকবে। এই অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরান পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রণালিটির নিরাপত্তা রক্ষায় ইরান নিজেকে অভিভাবক মনে করে এবং প্রয়োজনে নমনীয়তা দেখাবে। তবে দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে তেহরান প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত-এই বার্তাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
এই দ্বিমুখী অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে প্রণালি খোলা রাখার আশ্বাস, অন্যদিকে অবরোধ নিয়ে উত্তেজনা-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো নাজুক। তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতোমধ্যেই এর বড় প্রভাব দেখা গেছে তেলের বাজারে।

তেলের দাম পতন
ইরানের ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বড় পতনের মুখে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার পর বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তেলের মজুত ছাড়তে শুরু করেন। ফল হিসেবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়মিত জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া মানে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। এই প্রত্যাশাই বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
জ্বালানির দাম কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু তেলবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি স্বস্তির খবর।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ স্থিতিশীল নয়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবারও বাড়লে তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকে সাময়িক স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।
প্রণালিটি উন্মুক্ত থাকা মানেই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় স্বস্তি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখনো রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রেই রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন সবার প্রধান প্রশ্ন।
তথ্য সূত্র : আল-জাজিরা এবং রয়টার্স
-পতাকানিউজ

