যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ছাড়িয়ে সরাসরি বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে ইরান। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য সুখবর দিয়েছে তেহরান। ইরান জানিয়েছে, যেসব দেশ তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছে এবং যাদের তারা ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করছে, তাদের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
ইরানের এই ঘোষণায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়া।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশে তেল ও গ্যাস সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়।
এর মধ্যে কাতারের একটি বড় গ্যাস স্থাপনায় হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ, বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির প্রায় ৯৯ শতাংশই আসে কাতার থেকে। ফলে এই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ
জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কায় সরকার শুরুতেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়। জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে সীমিত পরিসরে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা শুরু হয়। স্পট মার্কেট থেকেও তেল ও গ্যাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তারপরও শিল্প, পরিবহন ও কৃষি খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর কৃষি সেচ কার্যক্রম এবং পরিবহন খাতে চাপ বাড়ছে।
ইরানের ঘোষণা ও বাংলাদেশের স্বস্তি
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, অনেক দেশ তাদের জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং যেসব দেশকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
আরাগচি বলেন, ‘অনেক দেশের শিপিং কোম্পানি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমরা যাদের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করি বা বিশেষ কারণে অনুমতি দিয়েছি, তাদের জাহাজ নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান এবং ইরাকের মতো দেশ ইতোমধ্যে এই সুবিধা পেয়েছে এবং বাংলাদেশও এই তালিকায় থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব দেশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি নিয়েছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, যেসব দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িত বা ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আরাগচি বলেন, ‘আমরা এখন কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এই অঞ্চল একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তাই আমাদের শত্রু বা তাদের সহযোগীদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে অন্য দেশগুলোর জন্য পথ খোলা রয়েছে।’

কঠোর নজরদারিতে হরমুজ প্রণালি
বর্তমানে ইরান ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ টহলের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে কড়া নজরদারি বজায় রাখছে। অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রবেশ করলে তা আটকে দেওয়া হচ্ছে বলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানগামী একটি কনটেইনার জাহাজকে ট্রানজিট অনুমতি না থাকায় মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে দেয় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
আন্তর্জাতিক শিপিং পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করলেও মার্চ মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে এই সংখ্যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়।
বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবহন খাতে প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে দেখা যাচ্ছে। খুলনা অঞ্চলে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের জালিয়ারডাঙ্গা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান গাজী জানান, তিনি এ বছর দুই বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে সময়মতো সেচ দিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, ‘পেট্রল পাম্পে কয়েকবার গিয়েছি। কিন্তু গাড়ি ছাড়া অন্য পাত্রে তেল দিচ্ছে না। অথচ এখন সেচ না দিলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।’
একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পে জ্বালানি নিতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। এতে পরিবহন খাতেও চাপ তৈরি হচ্ছে। সমুদ্রবন্দর ও নৌপথে লাইটার জাহাজের জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটছে।
সামনে কী আশা করছে বাংলাদেশ
এমন পরিস্থিতিতে সরকার যখন বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে, তখন ইরানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজের চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে, তাহলে সরবরাহ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং পরিবহন খাতে চাপ কমবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমদানি করা জ্বালানি দ্রুত দেশে পৌঁছাবে এবং তা ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
-সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস
-পতাকানিউজ

