ইরানের নৌশক্তি ধ্বংস হয়নি বলে অবশেষে স্বীকার করলো পেন্টাগন। তাই যুদ্ধবিরতি এই সময়ে পুনরায় পুনর্গঠন হওয়ার চেষ্টা করছে ইরান। কারণ, যে কোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা শুরু করতে পারে। হামলার প্রস্তুতি ও পাল্টা হুঁশিয়ারিতে উত্তেজনা আরও ঘনীভূত
মধ্যপ্রাচ্যে টানটান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের একটি স্বীকারোক্তি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নৌশক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে-এমন দাবি করে আসছিল ওয়াশিংটন।
তবে এবার সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট করলেন মার্কিন সামরিক নেতৃত্বই। জানালেন, ইরানের নৌবাহিনী এখনো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি; বরং গুরুত্বপূর্ণ কিছু যুদ্ধক্ষমতা এখনো টিকে আছে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন কংগ্রেসের এক শুনানিতে বলেন, ইরানের কাছে এখনো দ্রুতগতির কিছু ‘ফাস্ট অ্যাটাক বোট’ রয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালিতে সক্রিয়। তাঁর ভাষায়, ‘ইরানের নৌশক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।’ এই মন্তব্য সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই দাবি, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ইরানের প্রায় সব নৌক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে।
এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৫৯টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। এমনকি তিনি এটাও বলেছিলেন যে, ইরানের হাতে এখন কেবল কিছু ছোট নৌকা অবশিষ্ট আছে এবং সেগুলোও ধ্বংস করা হবে। কিন্তু পেন্টাগনের নতুন অবস্থান সেই বক্তব্যকে কার্যত খণ্ডন করল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই স্বীকারোক্তি শুধু সামরিক অবস্থান নয়, বরং কৌশলগত হিসাব-নিকাশের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। সেখানে ইরানের সামান্য উপস্থিতিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে নেমেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা দাবি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করেছে তেহরান।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান মূলত দুটি লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করছে -প্রথমত, ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা অস্ত্র পুনরুদ্ধার; দ্বিতীয়ত, দ্রুত নতুন করে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তোলা। তাঁর মতে, এটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; বরং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার প্রস্তুতির অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। প্রায় ৪৫ মিনিটের এই ব্রিফিংয়ে সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এবং জেনারেল ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে ইরান সংকটে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ চলছে। বিশেষ করে, নতুন করে হামলা চালানো হলে তার সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে-সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এদিকে মার্কিন রাজনীতিতেও এই ইস্যু নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো সময় ইরানে হামলা চালাতে পারে। তবে তিনি এটিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এমন পদক্ষেপ মার্কিন সেনাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে এবং উভয় পক্ষেই ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি করবে।
অন্যদিকে, ইরান থেকেও পাল্টা হুঁশিয়ারি এসেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা চালাতে পারে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে এক ফোনালাপে পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেন, অতীতেও আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের পদক্ষেপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘সংলাপ আমাদের অগ্রাধিকার, কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবতে বাধ্য করছে।’

২০২৫ সালের জুনে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলাকালে প্রথমবার ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবারও আলোচনা চলার সময় দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হয় তেহরান। এই অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীন অবস্থানে রয়েছে।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হরমুজ প্রণালি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। পরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও তা এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
এই যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এমনকি ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুদ্ধের প্রভাবও বাড়ছে। ইরান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব সিনেটে নাকচ হয়ে গেছে। ৪৭-৫০ ভোটে প্রস্তাবটি বাতিল হওয়ায় কংগ্রেস এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরেকটি সুযোগ হারিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের ব্যয়ও ক্রমেই বাড়ছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্বাধীন সংস্থার মতে, প্রকৃত ব্যয় এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা যুদ্ধজাহাজগুলোতে নতুন করে জ্বালানি, খাদ্য ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হচ্ছে। গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাকসহ বিভিন্ন রণতরিতে রসদ তোলার দৃশ্য ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে।
এই রণতরিগুলো বর্তমানে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে সহায়তা করছে, যা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এক জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নতুন হামলার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। এর মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থাকলেও আস্থাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেন্টাগনের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি একটি বড় বার্তা বহন করছে-ইরানকে সম্পূর্ণভাবে সামরিকভাবে কোণঠাসা করা সহজ নয়। বরং এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যেখানে সামরিক ও কূটনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই টানাপোড়েন চলবে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে-তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট: যুদ্ধ থেমে নেই, বরং নতুন আকারে আবারও সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
তথ্য সূত্র : এনবিসি নিউজ/আল জাজিরা
-পতাকানিউজ

