দুবাই। আকাশছোয়া অট্টালিকা, সমুদ্র এবং স্বচ্ছ নীল আকাশ-এই চিত্র এতদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইকে আলাদা করে চিনিয়েছে বিশ্বে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাম জুমেইরাহ সৈকতের ক্লাবগুলো হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল, দুবাই মলের ঝরনার সামনে জমে পর্যটকের ভিড়, আর সূর্যাস্তের আলোয় ঝলমল করে বুর্জ খলিফা।
কিন্তু গত শনিবার সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যায়। কয়েক দশক ধরে পুঁজি, বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতার নিরাপদ মরুদ্যান হিসেবে পরিচিত শহরটির আকাশে শুরু হয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গর্জন। একের পর এক বিস্ফোরণ, ধোঁয়া আর আতঙ্কে মুহূর্তেই বিলাসী নগরীর পরিবেশ রূপ নেয় যুদ্ধের আবহে।
প্রতীকী স্থাপনা বুর্জ আল আরবের এর আশপাশে ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলে আগুন ধরে যায় এবং পাম জুমেইরাহ ও দুবাই মেরিনা এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। কয়েক দশক ধরে অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে নিরাপদ বাণিজ্যিক শহর হিসেবে গড়ে ওঠা দুবাইয়ে এমন হামলা বিরল।
বিমানবন্দর ও বন্দরেও ক্ষতি
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও আঘাতের খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র জেবেল আলী পোর্টের একটি জেটিতে আগুন ধরে। আবাসিক এলাকাও রক্ষা পায়নি। দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেইরাহর মতো উচ্চমূল্যের আবাসিক অঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
সম্প্রতি প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া ফেয়ারমন্ট দ্য পাম হোটেলের ক্ষতি উপসাগরীয় আতিথেয়তা শিল্পের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ধনীদের দুবাই ছাড়ার হিড়িক
হামলার পরই শহর ছাড়তে শুরু করেন বহু বিদেশি নাগরিক ও ধনী বাসিন্দা। বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যাহত হওয়ায় প্রাইভেট জেট হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ভরসা। হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় চার্টার বিমানের ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
মাসকাট থেকে ইস্তাম্বুলগামী ছোট নেক্সট্যান্ট জেটের ভাড়া প্রায় ৮৫ হাজার ইউরো, যা স্বাভাবিকের প্রায় তিন গুণ। মস্কোগামী প্রাইভেট চার্টারে প্রতি আসন ২০ হাজার ইউরো। রিয়াদ থেকে ইউরোপে চার্টার ভাড়া সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে। ইউরোপের কিছু রুটে ভাড়া প্রায় ৯০ হাজার ইউরো পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বৈশ্বিক এভিয়েশন হাবে অনিশ্চয়তা
দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আকাশপথ দীর্ঘ সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বা বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো বিকল্প রুট খুঁজতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে তুরস্ককে। বিশেষ করে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ইতোমধ্যে বড় ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে বহু ফ্লাইটের ট্রানজিট ইস্তাম্বুলে সরতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারে ধাক্কা
করোনা মহামারির পর উপসাগরীয় অর্থনীতির ওপর আবারও বড় ধাক্কা নেমে এসেছে। বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাণিজ্যে অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দুবাই ও আবুধাবিতে বিস্ফোরণের পর সৌদি আরব, ওমান, মিশর ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে পতন হয়েছে। কোথাও কোথাও লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিতও করা হয়েছে।
বিমানবন্দর, বন্দর ও হোটেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পর্যটন ও পরিবহন খাত বড় ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় হামলার ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধেও আঘাত হেনেছে।
রমজানের ব্যবসায়িক সংস্কৃতিতেও প্রভাব
উপসাগরীয় অঞ্চলে পবিত্র রমজান মাসে করপোরেট ইফতার ও সাহরি ব্যবসায়িক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু চলমান উত্তেজনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের আয়োজন বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য আরও চাপে পড়েছে।
‘নিরাপদ মরুদ্যান’ ধারণা কি ভেঙে গেল?
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি—বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পর্যটন—গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি সাময়িক স্বস্তি দিলেও সেবাভিত্তিক অর্থনীতির ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া কঠিন।
দুবাইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের একটি ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে—অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের মাঝেও এটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল এক শহর।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপ কাউন্সিলর অন ফরেন রিলেশনস মনে করছে, শহরটি ঘুরে দাঁড়াতে পারলেও আগের মতো ‘নিরাপদ স্বর্গ’ হিসেবে তার ভাবমূর্তি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
-পতাকানিউজ

