যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে আক্রমন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বারবার জোর দিয়ে বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে। কিন্তু একই সমীকরণ ইসরায়েলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
গাজায় টানা সামরিক অভিযান, লেবানন ও সিরিয়ায় ধারাবাহিক আঘাত, আর এর মধ্যেই ইরানের সঙ্গে নতুন করে সরাসরি সংঘাত—সব মিলিয়ে ইসরায়েলি সামরিক যন্ত্র ইতোমধ্যেই বহু ফ্রন্টে ব্যস্ত। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর মূল্য শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিরূপ বার্তা আসতে পারে বা ইসরায়েলকে মূল্য দিতে হতে পারে।
গত শনিবার ইরানে হামলার পর থেকেই ইসরায়েল পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্কসংকেত, স্কুল বন্ধ, বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনাকে তলব—এসব এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। হাইফা ও তেল আবিবের মতো প্রধান শহরগুলো টানা হামলার আওতায় এসেছে। জরুরি সেবাগুলো চাপের মুখে। যে মাত্রার যুদ্ধ ইসরায়েল এত দিন গাজা বা প্রতিবেশী অঞ্চলে পরিচালনা করেছে, এখন সেই মাত্রার পাল্টা বাস্তবতা প্রথমবারের মতো সরাসরি অনুভব করছে তাদের নাগরিকেরা। বাংকার ও শেল্টারে আশ্রয় নেওয়াই হয়ে উঠেছে অনেকের নিয়মিত জীবনযাপন।
তবু আপাতত জনমতের বড় অংশ যুদ্ধপন্থী। ইসরায়েলের বড় শহরগুলোর মানুষের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, বহু মানুষ ইরানকে এমন এক অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে দেখেন, যাদের সম্পর্কে দশকের পর দশক ধরে শেখানো হয়েছে—তারা ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়। কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ছাড়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সরকারের পাশে অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় ঐক্যের এই আবহে যুদ্ধকে ‘প্রয়োজনীয় লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শির হেভার মনে করেন, যুদ্ধ শুরু হতেই দেশে একধরনের সামরিক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাতের সময় যে আতঙ্ক ও অস্তিত্ব সংকটের অনুভূতি কাজ করেছিল, এবার তার চেয়ে ভিন্ন এক মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। তখন ভয় ছিল—ইরান হয়তো সরাসরি রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এখন সেই ভয় অনেকাংশে কেটে গেছে এবং আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে কিছুটা একরোখা মনোভাবকে। এমনকি যুদ্ধের সমালোচকেরাও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দিচ্ছেন—যুদ্ধ হলে তা ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখা হোক। এতে এক ধরনের ধারণা স্পষ্ট হয়—যেন যুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণের ক্ষমতা পুরোপুরি ইসরায়েলের হাতেই।
সমালোচকদের একটি অংশ এই সমর্থনকে ইসরায়েলি সমাজের ক্রমবর্ধমান চরমপন্থার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। একসময় প্রান্তিক উগ্র ডানপন্থীরা এখন রাজনৈতিক কেন্দ্রের অংশ। মেরুকরণ বাড়ছে, অর্থনৈতিক চাপে তরুণ ও দক্ষ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দেশ ছাড়ছে। যারা দেশে থাকছেন, তাঁদের বড় অংশই ইরানকে দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে দেখে আসছেন। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সমাজ আরও সামরিকীকরণের দিকে ঝুঁকতে পারে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তাল এই পরিস্থিতির তুলনা টানেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ওপর নাৎসি জার্মানির বিমান হামলার সঙ্গে। তাঁর মতে, যেমন ব্রিটিশরা নিজেদের ‘অশুভ শক্তির’ বিরুদ্ধে লড়াই করছে বলে মনে করে বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল, তেমনি ইসরায়েলিদের বড় অংশও বিশ্বাস করে তারা নৈতিকভাবে সঠিক এক যুদ্ধে লিপ্ত। তিনি বলেন, ইসরায়েলে ছোটবেলা থেকেই ইরানকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শেখানো হয়—কিন্ডারগার্টেন থেকে সেনাবাহিনী পর্যন্ত এই বয়ান প্রতিষ্ঠিত।
তবে কয়েক সপ্তাহ পর সমাজ কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনিশ্চিত। ইতিহাস বলছে, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ কিংবা সাম্প্রতিক গাজা অভিযানের মতো ঘটনাতেও শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক সামাজিক প্রতিক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ডানপন্থী ও যুদ্ধমুখী মনোভাব আরও দৃঢ় হয়েছে। নেতানিয়াহুর ভাষণে বারবার উঠে আসছে—ইসরায়েলকে ‘তলোয়ারের ওপর ভর করেই’ টিকে থাকতে হবে। সমালোচকেরা বলছেন, এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়—রাষ্ট্রীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখতে এক স্থায়ী শত্রুর উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠেছে।
তবে সামাজিক আবেগের বাইরে রয়েছে কঠিন সামরিক বাস্তবতা। ইরানের মতো বিশাল ভূখণ্ড ও সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশের বিরুদ্ধে বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ কত দিন চালানো সম্ভব—এ প্রশ্নই এখন মুখ্য। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজে আত্তারের মতে, বিষয়টি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তার ওপর এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার কত দ্রুত নিঃশেষ হয়, তার ওপর।

তিনি জানান, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনেই ইরান ২০০–এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তুলনায়, আগের ১২ দিনের সংঘাতে ছোড়া হয়েছিল প্রায় ৫০০টি। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইসরায়েলকে একটি করে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়—যার ব্যয় বিপুল। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া এত দিন আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেত বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা
ইসরায়েলের তিনস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা—স্বল্পপাল্লার রকেট ঠেকাতে ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি পাল্লার জন্য ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ‘অ্যারো-২’ ও ‘অ্যারো-৩’—এখন চরম পরীক্ষার মুখে। মজুত ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা গোপন রাখা হলেও আগের সংঘাতে ভান্ডার দ্রুত কমে আসার ইঙ্গিত মিলেছিল। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হতে পারে, যেখানে সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এতে বেসামরিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আত্তারের দাবি, জুনের সংঘাতের পর থেকে ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। তবে হুমকি শুধু সংখ্যায় নয়, ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন ও লঞ্চার সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। দীর্ঘ, মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র—সবই ইরানের হাতে রয়েছে। যদিও কত লঞ্চার অক্ষত আছে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন সেই লঞ্চারগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালাচ্ছে।
সামরিক হিসাবের পাশাপাশি রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। গাজায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা অভিযানে গোলাবারুদের বিপুল ব্যয় এবং কয়েক লাখ রিজার্ভ সেনার দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন রাজকোষে বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে গাজা ও লেবানন অভিযানে ব্যয় পৌঁছায় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে, আর ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে তা ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ঠেকেছে। ফলস্বরূপ বাজেট ঘাটতি বেড়েছে, এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো সার্বভৌম রেটিং কমিয়েছে।
শির হেভারের মতে, ইসরায়েল এখন ঋণ, জ্বালানি, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবাসংকটের চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, কেবল অর্থনৈতিক সংকট সামরিক অভিযান থামাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ, যুদ্ধ এখন প্রযুক্তিনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে, তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি কেবল ইচ্ছাশক্তির নয়, সক্ষমতারও। জনসমর্থন, সামরিক মজুত, মিত্রদের সহায়তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতি—এই চার স্তম্ভের ভারসাম্য কত দিন ধরে রাখা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ইসরায়েলের স্থায়িত্ব। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, সেই ভারসাম্য তত কঠিন হয়ে উঠবে।
সূত্র : আল জাজিরা
-পতাকানিউজ

