ইরানের শাসন পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে সেটি বড় যুদ্ধে রূপ দিলেও শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন কঠিন মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। অত্যন্ত গোপনীয় একটি নথির বরাত দিয়ে শনিবার সংবাদ প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। ৭ মার্চ এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর তোলপাড় শুরু হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি তাহলে গোয়েন্দা প্রতিবেদন অবজ্ঞা করে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে ইরানিদের ওপর। প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিক্ষোভের বলি হচ্ছে ইরান? প্রতিবেদনটি ৭ মার্চ প্রকাশ হলেও এটি পড়ে ধারণা করা যায়, গোয়েন্দা নথিটি যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রস্তুতকৃত। এখন যুদ্ধ শুরুর পর কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজদের গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে অনুমেয় বিষয়টি টের পাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাহ্যিক সামরিক চাপ দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে ফেলা কঠিন। দেশটির ক্ষমতার কাঠামো বহু স্তরে গড়ে উঠেছে এবং তা সহজে ভেঙে পড়ার মতো নয়।
গোপন ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ধর্মীয় নেতৃত্ব, নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে শক্ত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সামরিক হামলা হলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। বরং এমন হামলা দেশের ভেতরে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও জোরালো করে তুলতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ দেশটির শাসন কাঠামোর ভেতরে উত্তরসূরি নির্ধারণের একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা রয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ নিহত হলেও নতুন নেতৃত্ব দ্রুত দায়িত্ব নিতে পারে।
মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম শক্ত ভিত্তি হচ্ছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী শুধু সামরিক শক্তিই নয়, দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং রাজনীতির বহু অংশের ওপরও প্রভাব রাখে। ফলে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লেও এই বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে।
গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ভেতরে বর্তমানে বড় ধরনের গণআন্দোলন বা বিদ্রোহের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অসন্তোষ নিয়ে বিক্ষোভ হলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা শাসনব্যবস্থাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে থেকে সামরিক হামলা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের বিরোধী শক্তিগুলোও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের পাশে দাঁড়াতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নানা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও ইরান তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত ভেঙে পড়ার মতো নয়।
শাসন ব্যবস্থা বদল কঠিন
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলাতে হলে কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। দেশের ভেতরে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি তৈরি না হলে বাইরের চাপ দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো কঠিন।
প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বড় ধরনের সামরিক হামলা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ ধরনের সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান প্রশ্নে যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সামরিক অভিযান শুরু করা সহজ হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সামাল দেওয়া অনেক কঠিন হতে পারে।

গোপন ওই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বোঝা যায় ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা জটিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা বহু বছর ধরে নানা চাপের মধ্যেও টিকে আছে। ফলে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সেটিকে দ্রুত বদলে ফেলার ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিল নাও থাকতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের কৌশল নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই এই সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে।
-সূত্র : দ্যা ওয়াশিটন পোস্ট
-পতাকানিউজ

