ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য সময়সীমা শেষ হওয়ার খবর, মার্কিন নৌমন্ত্রীর আকস্মিক পদত্যাগ, পারস্য উপসাগরের সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল নিয়ে নতুন হুমকি এবং নৌ অবরোধ-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আগামী রোববার শেষ হতে পারে-এমন বার্তা ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিবে পাঠানো হয়েছে। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত সময়সীমা দ্রুত শেষের দিকে যাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার বদলে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইছে ওয়াশিংটন।
তবে ইসরায়েলি সূত্রগুলো মনে করছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারা মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেও মন্তব্য করেছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ইরানের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাব পাওয়ার জন্য ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেননি। বরং ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করার সুযোগ দিতেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান।
এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌমন্ত্রী জন সি ফেলান হঠাৎ পদত্যাগ করেছেন। পেন্টাগন জানিয়েছে, তাঁর পদত্যাগ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের মুখপাত্র ফেলানের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আন্ডার সেক্রেটারি হাং কাও ভারপ্রাপ্ত নৌমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল ও ক্লাউড অবকাঠামো নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ উপসাগরের তলদেশের গুরুত্বপূর্ণ কেবল নেটওয়ার্কের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে সরাসরি হুমকির ইঙ্গিত বহন করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়; এটি সাবমেরিন কেবলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরও। এই পথ দিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের ইন্টারনেট সংযোগের প্রধান কেবলগুলো গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের দেশগুলো সমুদ্রপথভিত্তিক ইন্টারনেট সংযোগের ওপর ইরানের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরশীল।

তাসনিমের প্রকাশিত মানচিত্রে কেবল, ল্যান্ডিং স্টেশন ও ডেটা সেন্টারগুলোকে কৌশলগত চাপের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ করে আরব আমিরাত ও বাহরাইনের ক্লাউড অবকাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে বোঝানো হয়েছে-এসব স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হলে অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরব আমিরাত ও বাহরাইনে আমাজন ওয়েব সার্ভিসের স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলার দাবিও করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক ক্লাউড অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ আরও জোরদার হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ৩১টি জাহাজ-যার বেশিরভাগই জ্বালানি তেলের ট্যাংকার-দিক পরিবর্তন করতে বা বন্দরে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশই সেই নির্দেশনা মেনেছে। এই নৌ অবরোধে ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা, ১৭টি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক বিমান অংশ নিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরপরই তেহরান বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, মার্কিন নৌ অবরোধই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে কূটনৈতিক অচলাবস্থা, সামরিক চাপ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে ঘিরে নতুন হুমকির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়-এখন সেদিকেই তাকিয়ে বিশ্ব।
তথ্য সূত্র : আল জাজিরা / কান
-পতাকানিউজ

