যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত থেকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে দূরে রাখার কৌশল অনুসরণ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা সেই অবস্থানকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। রিয়াদের অভিযোগ, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ধারাবাহিকভাবে সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে ওই গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।
এ অবস্থায় রিয়াদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন-নিরাপত্তা হুমকির জবাবে আরও কঠোর সামরিক পথ বেছে নেবে, নাকি উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করবে?
সংঘাতের নতুন সমীকরণ
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাতে মূলত দুটি পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। একদিকে ইরান ও দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং ইরাকের ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)।
সৌদি আরবের দাবি, পিএমএফ অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে তাদের ভূখণ্ডে। এরই জবাবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলা চালায় রিয়াদ। যদিও লেবাননের হিজবুল্লাহ ইরানপন্থী জোটের অংশ, বর্তমান সংঘাতে তারা তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পক্ষের সঙ্গে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম), সৌদি আরব, উপসাগরীয় কয়েকটি আরব দেশ এবং জর্ডান। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল এই সংঘাতের অন্যতম প্রেক্ষাপট হলেও বর্তমানে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না।
কেন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন রিয়াদ
সৌদি যুবরাজ ও কার্যত দেশটির শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভিশন ২০৩০’ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন শিল্প গড়ে তোলা, ডেটা সেন্টারের মতো আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
কিন্তু ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ইয়েমেনের হুতিদের ড্রোন হামলা কিংবা ইরান থেকে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা ‘ভিশন ২০৩০’-এর বাস্তবায়নের অন্যতম বড় বাধা হয়ে উঠছে।

২০১৯ সালের শিক্ষা এখনো তাড়া করে
সৌদি আরবের এই উদ্বেগ নতুন নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবকাইক ও খুরাইসের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় সমন্বিত ড্রোন হামলায় কয়েক দিনের জন্য দেশটির প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়েছিল।
প্রথমে হামলার দায় ইয়েমেনের হুতিদের ওপর চাপানো হলেও পরবর্তী বিভিন্ন বিশ্লেষণে ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ওই হামলা সৌদি আরবকে বুঝিয়ে দেয়, তাদের কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সেই আশঙ্কাই যেন আবার ফিরে এসেছে। গত সোমবার প্রকাশিত উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, আবকাইক তেল স্থাপনাটি আবারও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এর পেছনেও ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তেল রপ্তানির নতুন সংকট
সৌদি অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো তেল। আর সেই তেল রপ্তানির পথ নিয়েই নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। অথচ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চল থেকে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠানো শুরু করে। সেখান থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখা হয়।
কিন্তু বিকল্প এই পথও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হামলার পর হুতিরা আবহা ও জিজান বিমানবন্দরে পাল্টা হামলা চালায়। পাশাপাশি লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালিও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। এতে এশিয়ার বাজারে সৌদি তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প রুটও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সংঘাতের বিস্তার ও পুরোনো যুদ্ধের ছায়া
ইরান সম্প্রতি জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন বিধিনিষেধ উপেক্ষা করা জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ইয়েমেনের হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা না হলে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে সৌদি আরব প্রায় সাত বছর ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালিয়েও হুতিদের পরাজিত করতে পারেনি। ওই যুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি সৃষ্টি করেছিল। ২০২২ সালে উভয় পক্ষের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়েছে।
আজ দক্ষিণে ইয়েমেনের হুতি এবং উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাপের মুখে রয়েছে সৌদি আরব।
সামনে কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এমন বহুমুখী নিরাপত্তা হুমকি ‘ভিশন ২০৩০’-এর পরিকল্পনায় ছিল না। এখন রিয়াদের সামনে একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ-একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি
-পতাকানিউজ

