যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর প্রায় এক মাস পর আবারও দেশজুড়ে রাস্তায় নেমেছেন ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। শনিবার অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভ ও সমাবেশ ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পর ‘নো কিংস’আন্দোলনের তৃতীয় দফার জাতীয় কর্মসূচি।
ট্রাম্প যখন ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো বিশ্বকে অশান্ত করে তোলেছেন, তখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প বিরোধী এই অভিযানকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হচ্ছে। কারণ, অধিকাংশ আমেরিকান চান না, দেশটি যুদ্ধে জড়িত হোক। কিন্তু ট্রাম্প নিজস্ব ক্ষমতাবলে যুদ্ধে জড়িয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো পৃথিবীকে অনিশ্চিত পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলে মার্কিনীদের বড় অংশ মনে করছেন।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসিসহ বড় শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য জনসমাগম হয়। একই সঙ্গে ইউরোপের রোম, প্যারিস ও বার্লিনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শহরেও সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আয়োজক সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রগতিশীল নাগরিক জোটগুলো এবার বড় শহরের পাশাপাশি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায়ও কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ইনডিভিজিবলের সহপ্রতিষ্ঠাতা লিয়া গ্রিনবার্গ বলেন, এই কর্মসূচির গুরুত্ব শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নয়, বরং কোন কোন এলাকায় মানুষ প্রতিবাদে নেমেছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিনেসোটায় সবচেয়ে বড় সমাবেশ
সবচেয়ে বড় সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়েছে মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস–সেন্ট পল এলাকায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় দুই লাখ মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা এই কর্মসূচির অন্যতম বৃহৎ জমায়েত।
গত ডিসেম্বরে এই এলাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় ফেডারেল বাহিনীর অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক অ্যালেক্স প্রেত্তি ও রেনি নিকোল গুড নিহত হন বলে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন। সেই ঘটনার প্রতিবাদও এই সমাবেশে গুরুত্ব পায় এবং নিহতদের স্মরণে কর্মসূচি পালন করা হয়।
রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ
মিনেসোটার সমাবেশে প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বক্তব্য দেন। এছাড়া সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন ও জোয়ান বায়েজ সংগীত পরিবেশন করেন। হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো এক ভিডিও বার্তায় বিক্ষোভকারীদের সাহসের প্রশংসা করেন এবং তাদের আন্দোলনকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই হিসেবে উল্লেখ করেন।
ওয়াশিংটন ডিসিতে লিঙ্কন মেমোরিয়াল ও ওয়াশিংটন মনুমেন্ট এলাকায়ও বিপুলসংখ্যক মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে জড়ো হন। সেখানে স্যান্ডার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে কর্তৃত্ববাদী শাসন বা ধনীদের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়া হবে না এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন চলবে।

ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি, ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ধরেন। অনেকের মতে, এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই আন্দোলনকে সাম্প্রতিক সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় সমন্বিত বিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং এতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের অংশগ্রহণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ
এর আগে গত বছর জুন ও অক্টোবরে ‘নো কিংস’ আন্দোলনের প্রথম দুই দফার কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে লাখো মানুষ অংশ নেন। নতুন এই কর্মসূচি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিরোধী শিবির এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে এবং কংগ্রেসে আসন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েও সক্রিয় রয়েছে।
-সূত্র : রয়টার্স
-পতাকানিউজ

