ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে এবার অস্ত্র ভাণ্ডারের হালখাতায় নজর বুলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে অস্ত্রের মজুদ কী পরিমাণ কমছে। এখন যদি নতুন করে যুদ্ধ চালাতে হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। সেই শঙ্কার ভাঁজ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমরবিদদের চোখ কপালে তুলেছে।
ইরানের সঙ্গে এখন যুদ্ধ বিরতি চলছে। দুই সপ্তাহ বিরতি শেষে ইরানের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম না হলেও ট্রাম্প নানা ধরনের হুমকির পর নতুন করে অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল রেখেছেন।
কূটনীতির মাঠে বল খেলতে থাকা ট্রাম্পের বাহিনী এখন অস্ত্র-গোলার হিসাব কষতে বসেছেন। সেই হিসাবের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা সিএনএন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনেই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংঘাতটি শেষ হলেও যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য এখন স্পষ্ট হচ্ছে-মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, যদি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন কোনো বড় সংঘাত শুরু হয়, তাহলে অন্তত স্বল্প সময়ের জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র গোলাবারুদের চাপের মুখে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে সাত সপ্তাহের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের অন্তত ৪৫ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক থাড ব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক ইন্টারসেপ্টরও ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব তথ্য পেন্টাগনের গোপন নথিতে থাকা হিসাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে গেছে।
শুধু এ ব্যবস্থাগুলোই নয়, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে দূরপাল্লার জয়েন্ট এয়ার টু সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল (জেএএসএসএম)-এর ২০ শতাংশের বেশি এবং এসএম–৩ ও এসএম–৬ ক্ষেপণাস্ত্রেরও উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার হয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর মধ্যে অন্যতম—বিশেষ করে দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত ও আকাশ প্রতিরক্ষায়।
পেন্টাগন চলতি বছরের শুরুতেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে একাধিক চুক্তি করেছে। কিন্তু সিএসআইএসের বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলা হয়েছে, উৎপাদন বাড়ালেও অস্ত্রভান্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বল্পমেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ালে চাপ বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে বড় সংকটে পড়বে না। কারণ স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র এখনও রয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে-বিশেষ করে যদি প্রতিপক্ষ হয় চীনের মতো সমমানের সামরিক শক্তি।
মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং সিএসআইএস প্রতিবেদনের সহলেখক মার্ক ক্যানসিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, ‘অতি উচ্চমাত্রায় গোলাবারুদ ব্যবহার পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিরক্ষায় একটি স্পষ্ট ঘাটতি তৈরি করেছে।’ তাঁর মতে, এই ঘাটতি পূরণে এক থেকে চার বছর লাগতে পারে এবং পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে আরও কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করতে রাজি নয়।

সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, প্রেসিডেন্টের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সামরিক বাহিনীর হাতে প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে। তাঁর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক সফল সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী অস্ত্রভান্ডার নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে এই অবস্থান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে কিছুটা দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু একই সময়ে তিনি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত অর্থায়নের অনুরোধও জানিয়েছেন। গত মাসে তিনি বলেন, ‘আমাদের উচ্চমানের গোলাবারুদের যথেষ্ট মজুত আছে, তবে আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে উৎপাদন বাড়াতে চাই।’
সিএসআইএস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করবে। কিন্তু অতীতে কম চাহিদা দেওয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ সীমিতই থাকবে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতারা দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনসহ অন্য কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তার কারণে মজুতের ওপর আগেই চাপ রয়েছে-ইরান যুদ্ধ সেই চাপ আরও বাড়াবে।
ক্যাপিটল হিলে এ নিয়ে রাজনৈতিক উদ্বেগও বাড়ছে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা জানতে চাইছেন, যুদ্ধের কারণে গোলাবারুদের মজুত কমে গেলে তা মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষায় কী প্রভাব ফেলবে। অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলি বলেছেন, ইরানের বিপুল সংখ্যক শাহেদ ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘একসময় এটি একটি গাণিতিক সমস্যায় পরিণত হবে-আমরা কোথা থেকে আকাশ প্রতিরক্ষার গোলাবারুদ পাব?’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। আধুনিক যুদ্ধ শুধু প্রযুক্তি নয়, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। আর সেই জায়গাতেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-পরবর্তী বড় সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র কি তার অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন করতে পারবে?
অস্ত্র ভান্ডারের মজুদ ফুরিয়ে আসার এই তথ্য ট্রাম্প ভালোভাবেই জানেন বলেই তিনি ইরানকে হুমকি দিয়ে চুক্তি করতে চাইছেন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যদি হুমকির মুখে দ্রুত চুক্তি করে, তবেই নিজকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবেন ট্রাম্প। আর যদি ইরান নিজদের অবস্থান ধরে রাখে তাহলেও ট্রাম্পও পুনরায় যুদ্ধ শুরু না করে ইরানের বন্দর অবরোধ করে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ ধরে গিয়ে এগোতে পারেন।
-তথ্য সূত্র : সিএনএন
-পতাকানিউজ

