ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে একটি সরু কিন্তু কৌশলগতভাবে বিস্ফোরক জলপথের ওপর—হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যাবে কি না, সেটিই নির্ধারণ করতে পারে শুধু যুদ্ধের গতিপথ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও। একই সঙ্গে এটি ঠিক করে দিতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না।
ইতিহাস বলে, এমন সংকটের মুহূর্তে সামরিক শক্তির চেয়ে কখনো কখনো বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে কূটনৈতিক প্রজ্ঞা। আর সেই শিক্ষা খুঁজতে গেলে তাকাতে হয় তুরস্কের দিকে—বিশেষ করে ডারডানেলেস প্রণালিকে ঘিরে তাদের অভিজ্ঞতার দিকে।
বর্তমানে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি সরু সামুদ্রিক পথ কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বিপুল প্রভাব ফেলতে পারে। পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় ডারডানেলেস প্রণালির ইতিহাস নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—যে পথ ইজিয়ান সাগরকে মারমারা হয়ে কৃষ্ণসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
আজকের বিশ্বে হরমুজ শুধু একটি জলপথ নয়—এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামরিক সমাধান খোঁজার চিন্তাই নিজেই একটি বিপজ্জনক কৌশল।
বড় শক্তিগুলোর কাছে এমন জলপথকে অনেক সময় একটি সামরিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে হতে পারে—যেন শক্তি প্রয়োগ করলেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের কৌশলগত প্রণালিগুলো কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এগুলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের জটিল পরীক্ষাগার।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স এই বাস্তবতা নির্মমভাবে উপলব্ধি করেছিল। অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বে উইনস্টন চার্চিল যে পরিকল্পনা করেছিলেন—যা ইতিহাসে গ্যালিপোলি অভিযান নামে পরিচিত—তা ছিল এক উচ্চাভিলাষী কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপর্যয়কর উদ্যোগ।
এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ডারডানেলেস খুলে দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা এবং অটোমান সাম্রাজ্যকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে গিয়ে তা পরিণত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ব্যর্থতায়। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান—যার মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার মিত্রবাহিনীর এবং ৮৬ হাজার অটোমান সেনা।
এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও ছিল বড়। চার্চিলকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
তুরস্কের ইতিহাসে অবশ্য গ্যালিপোলি পরাজয়ের গল্প নয়—এটি জাতীয় আত্মপরিচয়ের অংশ। এখানেই প্রথম জাতীয় নায়ক হিসেবে উঠে আসেন মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক। “চানাককালে অতিক্রম করা যাবে না”—এই স্লোগান আজও তুর্কি জাতীয় চেতনার অংশ।
এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল ভূরাজনৈতিক। ব্রিটিশদের ব্যর্থতা রাশিয়ার সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ করে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে রাজতন্ত্রের পতন এবং বলশেভিক বিপ্লবের পথ সহজ করে দেয়।
এই ইতিহাস আজকের ওয়াশিংটনের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন—শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র গুরুতর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইরানের কাছে রয়েছে উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং সমুদ্রে মাইন পেতে দেওয়ার কৌশল—যা শক্তিশালী নৌবাহিনীকেও বিপাকে ফেলতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে বিকল্প কেবল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বা ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া—এমন সরল সমীকরণ নয়। তিনি চাইলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি টেকসই সমঝোতার পথও বেছে নিতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে ১৯৩৬ সালের মন্ট্রে কনভেনশন একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক যেমন তার প্রণালির ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়।
ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ১০টি দেশের অংশগ্রহণে হওয়া এই চুক্তি এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করেছিল। শান্তিকালে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় থাকে, আবার যুদ্ধের সময় নিরাপত্তা বিবেচনায় তুরস্ক প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতাও পায়।
সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের সময় এই ক্ষমতাই ব্যবহার করে তুরস্ক রুশ যুদ্ধজাহাজের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। ফলে মন্ট্রে চুক্তি শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং আজও কার্যকর একটি কৌশলগত কাঠামো।
অবশ্য হরমুজ প্রণালি এবং তুরস্কের প্রণালিগুলোর পরিস্থিতি এক নয়। তবুও মন্ট্রে মডেল থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত এবং প্রধান জাহাজ চলাচলের পথগুলো মূলত ওমানের জলসীমার মধ্যে পড়ে। ফলে একটি কার্যকর চুক্তি করতে গেলে বহুপক্ষীয় কাঠামো প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—তেলবাহী জাহাজে হামলা না করা, সমুদ্রে মাইন না পাতা এবং সংঘাত এড়াতে কঠোর নিরাপত্তা বিধান। এই ব্যবস্থার তদারকিতে জাতিসংঘ বা উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি ছোট পর্যবেক্ষক দল কাজ করতে পারে।
ওয়াশিংটনের উচিত হবে এমন একটি বহুপক্ষীয় কাঠামো প্রস্তাব করা, যা একদিকে অবাধ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দেবে, অন্যদিকে ইরানের কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় নেবে। বিনিময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি আইনি ও যাচাইযোগ্য বাণিজ্যিক নিরাপত্তা কাঠামো দাবি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা কল্পনাপ্রসূত ধারণা দিয়ে আসবে না। বরং বাস্তবতা মেনে নিতে হবে—ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তি এবং তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; বরং এটি বাস্তববাদী কূটনীতি।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—কৌশলগত চেকপয়েন্টগুলো কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এগুলো টিকে থাকে নিয়ম, সমঝোতা এবং ভারসাম্যের ওপর।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি এই শিক্ষা উপেক্ষা করেন, তাহলে হরমুজ প্রণালি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের জন্য আরেকটি গ্যালিপোলিতে পরিণত হতে পারে।
এখনই তাঁর সামনে সুযোগ রয়েছে—ইতিহাসের ভুল পুনরাবৃত্তি না করে একটি কার্যকর সমঝোতার ভিত্তি গড়ে তোলার।
আসলি আইদিনতাসবাস
থিঙ্কট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো ও তুরস্ক প্রকল্পের পরিচালক
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস
-পতাকানিউজ

