বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, সাংবিধানিক সংস্কার ও রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল ইতোমধ্যেই নিজেদের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
নির্বাচনের ভোটগ্রহণ নির্ধারিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না দলটি, ফলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে বিএনপি ও তাদের পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইশতেহারগুলোতে যেমন নতুন বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণায় থাকা পুরনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তিও চোখে পড়ছে।
তাদের মতে, বেশিরভাগ দলই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাংবিধানিক সংস্কারকে গুরুত্ব দিলেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা অর্থনৈতিক রূপরেখা অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, কিছু সাংবিধানিক সংস্কার প্রশ্নে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিএনপির ইশতেহার: রাষ্ট্র সংস্কার থেকে অর্থনৈতিক লক্ষ্য
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবার প্রথমবারের মতো দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব গ্রহণ করা রহমানের অধীনেই এবারের নির্বাচনী কৌশল পরিচালিত হচ্ছে।
ঘোষিত ইশতেহারে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক নানা পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড ও কৃষি বীমা, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল, বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দলটি।
রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া সরকারি খাতে পাঁচ লাখ শূন্য পদে নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল, পেনশন ফান্ড, বেকারভাতা এবং আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও উল্লেখ আছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতির অনেকগুলোই ২০১৮ সালের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের ধারাবাহিকতা বহন করছে, যেখানে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সংসদীয় সংস্কারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার: ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি
২০০৮ সালের পর প্রথমবার নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। আদালতের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি আবার নির্বাচনী মাঠে ফিরেছে।
তাদের ইশতেহারে ২৬টি অগ্রাধিকার খাত এবং ৪১ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। দলটির দাবি, ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের ঘোষণায়।

নারী ইস্যু ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মজীবী নারীদের সম্মতির ভিত্তিতে কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নারী অধিকার বিষয়ে অতীত অবস্থানের কারণে এসব প্রতিশ্রুতির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এনসিপির ইশতেহার: তরুণদের রাজনীতি ও সংস্কারের বার্তা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে রাজনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা প্রস্তাব দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই দলটি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং অতীত রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে।

তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ভোটাধিকার বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা, পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান, চাঁদাবাজি বন্ধ, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, মেধাবীদের দেশে ফেরানো এবং সংসদে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন। পাশাপাশি মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, পিরিয়ড লিভ এবং কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধার মতো সামাজিক নীতিও প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহার: শরিয়ার প্রাধান্য ও পিআর পদ্ধতির দাবি
চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন তাদের ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়ার প্রাধান্যসহ ৩০ দফা মৌলিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে নারী, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দলটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে জনমতের প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হয় এবং কার্যকর সংসদ গঠন সম্ভব হয়। মৌলিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিশেষ কর্মসূচি, নীতিগত অবস্থান এবং খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন: প্রতিশ্রুতি আছে, রোডম্যাপ কতটা স্পষ্ট?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দলগুলো বুঝতে পেরেছে যে জনঅসন্তোষ উপেক্ষা করা যায় না। ফলে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা প্রতিশ্রুতি যুক্ত করা হয়েছে। তবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণার একটি ঐতিহ্য থাকলেও নির্বাচনের পর অনেক সময় সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। তার মতে, এবারের ইশতেহারগুলোতে আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি, অর্থায়ন এবং দক্ষতার প্রশ্ন এখনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
-পতাকানিউজ

