চলতি মাসে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বৈঠক অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই সাক্ষাতে যুবরাজ কয়েক শ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছেন, যা যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু তিনি ইসরায়েলের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা ট্রাম্পসহ পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলো দীর্ঘদিন ধরে চেয়ে আসছে। এই প্রত্যাখ্যান বৈঠককে উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে, যদিও উভয় নেতা প্রকাশ্যে একে অপরকে প্রশংসা করেছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো এবং সুদানের সাথে চুক্তি করে, যা দূতাবাস খোলা, বাণিজ্য এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করে। এই চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন গতিশীলতা তৈরি করেছে, কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনে হামলার পর অঞ্চলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব দেশ চুক্তি করেছে, তারা অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে, এবং নতুন চুক্তির সম্ভাবনা কমেছে। গাজায় যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব এখনো অব্যাহত, যা সৌদি আরবসহ অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, পূর্বাঞ্চলের সব দেশের সাথে ভালো সম্পর্ক ইতিবাচক, এবং সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হতে চায়। তবে তিনি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের স্পষ্ট পথ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এগোতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই অবস্থান দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রতিফলিত করে, যা ট্রাম্পকে হতাশ করেছে। সৌদি আরবের এই প্রত্যাখ্যান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে, যদিও ট্রাম্প এখনো আশাবাদী।
ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক করা’ বলতে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, গোয়েন্দা এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বোঝায়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল গঠনের পর থেকে আরব দেশগুলো এটিকে বয়কট করে আসছে, বিশেষ করে নাকবা এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলোর কারণে। আরব লিগের প্রস্তাবগুলো এই বয়কটকে আনুষ্ঠানিক করেছে, যদিও কিছু দেশ গোপনে যোগাযোগ রাখত। এই ‘স্বাভাবিকীকরণ’ অনেকের কাছে বিতর্কিত, কারণ এটি ফিলিস্তিনি অধিকারকে উপেক্ষা করার মতো মনে হয়, বিশেষ করে গাজা এবং পশ্চিম তীরে চলমান দমননীতির পরিপ্রেক্ষিতে।
১৯৭৯ সালে মিসর এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইসরায়েলের সাথে শান্তিচুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছে এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসেছে। কিন্তু এগুলো আরব বিশ্বে সমালোচিত হয়েছে। ২০০২ সালের আরব পিস ইনিশিয়েটিভে সৌদি নেতৃত্বে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, ইসরায়েল দখলকৃত ভূমি ছাড়লে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, কিন্তু ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই উদ্যোগ পরবর্তী সম্মেলনগুলোতেও সমর্থিত হয়েছে।
২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন যোগ দেয়, যা বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষায় অগ্রগতি এনেছে। আমিরাত-ইসরায়েল বাণিজ্য ২০২৪ সালে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পরে সুদান এবং মরক্কো যোগ দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে এসেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এগুলোকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে দেখেছে, এবং ইরানের মতো দেশগুলো সমালোচনা করেছে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, যাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, নতুন চুক্তিগুলোকে থামিয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া এগোবে না বলে জানিয়েছে। জর্ডান এবং মরক্কোতে জনবিক্ষোভ হয়েছে। কাতার এবং তুরস্ক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে বা সীমিত করেছে। সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেছেন, সিরিয়া ইসরায়েলের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসবে না, যদিও কিছু মধ্যস্থতায় অগ্রগতির কথা আছে, এবং তিনি গোলান মালভূমি ফেরতের দাবি করেছেন।
ইরান, ইরাক, ওমান, কুয়েতসহ অনেক দেশ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করেছে। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে জনমত ইসরায়েলবিরোধী। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৭ নভেম্বর ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যাতে গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানোর কথা আছে, যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, কাতার এবং আমিরাতের সেনা থাকতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের চলমান অভিযানগুলো এই পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
পতাকানিউজ/এনটি

