ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক জোটগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হলেও, হঠাৎ করেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে বড় ধরনের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ভাঙনের সর্বশেষ ও সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধাক্কা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি ২৬৮টি আসনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে শুধু ফাটলই ধরেনি, বরং ইসলামপন্থী রাজনীতি কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর আগে ইসলামপন্থী দলগুলোর একটি অংশ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়। অন্য অংশটি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল। ফলে ধারণা করা হচ্ছিল, এই সম্মিলিত শক্তি বিএনপি জোটের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু মাঝপথে ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানোয় সেই হিসাব ভেস্তে গেছে।
জামায়াত জোটে এই ভাঙনের খবরে স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি দেখা গেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে। তবে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওদের জোটে কী হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের মন্তব্য করার কী আছে? আমরা কোনো মন্তব্য করব না।’
এর আগেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে একক নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পরদিন শনিবার সকালে জরুরি বৈঠকে বসেছে। এই বৈঠকেই জোটের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দলটি ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়ায় এসব আসনে দেওয়া সব প্রার্থী বহাল থাকছেন। বাকি ৩২টি আসনে দলটি তাদের পছন্দের কোনো দলকে সমর্থন দিতে পারে।
ইসলামী আন্দোলনের এই সিদ্ধান্তে ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার যে পরিকল্পনা ছিল, তা কার্যত ভেস্তে গেছে। আগে থেকেই ইসলামপন্থী দলগুলোর একটি অংশ বিএনপি জোটে যুক্ত ছিল। নতুন করে বিভাজনের ফলে ইসলামপন্থী রাজনীতি তিন ধারায় বিভক্ত হলো।
তবে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা এখনো বলছেন, চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি। তাঁদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনার জন্য এখনো কিছুটা সময় হাতে রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করে, জামায়াতের পক্ষ থেকে তারা উপেক্ষা ও অসম্মানের শিকার হয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০ দলের শীর্ষ নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে ২৫৩টি সংসদীয় আসনে সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা দেন। ওই সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল। কিন্তু সমঝোতা না হওয়ায় এখন ওই আসনগুলোতেও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ থেকে ইসলামী আন্দোলনের সরে যাওয়ার মাধ্যমে ইসলামপন্থী রাজনীতি তিনটি পৃথক ধারায় ভাগ হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’, যেখানে পাঁচটি ইসলামি দল রয়েছে। অন্যদিকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তৃতীয় ধারায় রয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে থাকা তিনটি ইসলামি দল। অবশ্য, বিএনপি জোটে আরো একটি ইসলামিক দল যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও এখনো সেই ঘোষণা আসেনি।
আসন বণ্টনেই মূল বিরোধ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মূলত আসন বণ্টনকে কেন্দ্র করেই ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় জোটের বিচ্ছেদ ঘটে। শুরু থেকেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ছিল। ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ৭০–৮০টি আসন, বিপরীতে জামায়াত তাদের ৩০–৩৫টি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল। পরে জামায়াত ৪০, এমনকি ৪৫টি আসনে ছাড় দিতে রাজি হলেও ইসলামী আন্দোলন তা গ্রহণ করেনি।
এই অবস্থায় জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সন্দেহ তৈরি হয়—ইসলামী আন্দোলনের দাবি কেবল আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে জামায়াত সিদ্ধান্ত নেয়, ইসলামী আন্দোলনকে বাদ দিয়েই ১০ দল নিয়ে এগোনো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনও বিকল্প নির্বাচনী মোর্চা গঠনের চেষ্টা করে, তবে শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। দলটির ভেতরেও এ বিষয়ে মতভেদ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে দলের শীর্ষ দুই নেতা সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ও সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম উপস্থিত ছিলেন না। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের’ সমন্বয়ক এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘আমরা ওনাদের জন্য আসনও ফাঁকা রেখেছি, চেয়ারও খালি রেখেছি। এরপর আর কী করার ছিল?’
ভোটের মাঠে কী প্রভাব পড়বে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের সরে যাওয়ায় জামায়াতের জন্য ঝুঁকি কিছুটা বেড়েছে। কারণ, ইসলামপন্থী ভোটব্যাংক এখন বিভক্ত। পাশাপাশি বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় থাকা ইসলামি দলগুলোও ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইসলামপন্থী ভোট এক বাক্সে আনার যে স্বপ্ন ছিল, তা আপাতত ভেঙে গেছে। বাস্তবতা এখন তিন ধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই বিভাজনের মধ্যে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ‘১০–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ কতটা সংগঠিতভাবে এগোতে পারে, ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি কতটা প্রভাব ফেলবে এবং বিএনপির সঙ্গে থাকা ইসলামি দলগুলোর সমন্বয় ভোটের মাঠে কী ফল বয়ে আনবে—সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
-পতাকানিউজ/এসএমআর

