উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দল ‘ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়া’র ৮০ বছরপূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। শুক্রবার অনুষ্ঠিতব্য এই ঐতিহাসিক আয়োজন ঘিরে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নিরাপত্তার কড়াকড়িও দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, নেতা কিম জং উন বিদেশি অতিথিদের জন্য লাল গালিচা সংবর্ধনার পাশাপাশি দেশটির সর্বাধুনিক সামরিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করবেন এক জাঁকজমকপূর্ণ কুচকাওয়াজে।
দীর্ঘদিন ধরে এই উদযাপনকে গোপন রেখেছে উত্তর কোরিয়া। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সূত্র জানিয়েছে, কিম মাসের পর মাস ধরে এই বিশাল আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। সম্ভবত রাতে অনুষ্ঠিত এই প্যারেডে অংশ নেবে কয়েক হাজার মানুষ।
উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে এমন বৃহৎ আকারের প্রচারণা প্রদর্শন নতুন নয়। বিশেষ কোনো দিবস বা রাজনৈতিক বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশটি নিয়মিতই সামরিক শক্তি ও জনসমাবেশের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়ে থাকে।
ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার একমাত্র রাজনৈতিক দল, যা তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অধীনে চলছে। তাদের মতাদর্শে কমিউনিজমের সঙ্গে মিশে আছে কিম পরিবারের উক্তি, দর্শন ও আদর্শ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়া প্রথমবারের মতো তাদের নতুন প্রজন্মের আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘হাওসঙ-২০’, হাইপারসনিক গ্লাইড যান ‘হাওসঙ-১১ মা’ এবং আরও উন্নত অস্ত্র প্রদর্শন করতে পারে।
গত মাসেই কিম চীন সফরে গিয়ে দেশটির বিশাল সামরিক প্যারেডে অংশ নেন, যেখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পাশে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে উপস্থিত হন। এই সফরের পর কিমের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার সঙ্গে গত বছর স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির পর থেকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কও গভীর হয়েছে। কিম ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সৈন্য, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছেন।
এই মজবুত সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেই এবার চীন ও রাশিয়া তাদের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে পিয়ংইয়ংয়ে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ও রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ থাকবেন অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অনুষ্ঠানে থাকতে পারে বিশাল আকারের গণজিমন্যাস্টিক প্রদর্শনীও।
ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান তো লাম ও লাওসের প্রেসিডেন্ট থংলাউন সিসৌলিথও এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। মঙ্গলবার পিয়ংইয়ং পৌঁছে থংলাউনকে ২১টি বন্দুক সালাম ও রাজকীয় ভোজের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র কর্নেল লি সাং-জুন জানিয়েছেন, প্যারেডের আগে তারা বিভিন্ন সামরিক যান ও অস্ত্র সরঞ্জামের চলাচল শনাক্ত করেছেন।
কয়েক সপ্তাহ আগেই কিম ‘হাওসঙ-২০’ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য নতুন শক্তিশালী সলিড-ফুয়েল রকেট ইঞ্জিনের পরীক্ষা দেখেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরল জ্বালানির তুলনায় সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র বেশি স্থিতিশীল এবং দ্রুত মোতায়েন করা যায়, ফলে সহজে শনাক্ত করা কঠিন।
সম্প্রতি কিম একটি অস্ত্র প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন, যেখানে দেখানো হয় নতুন স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘হাওসঙ-১১ মা’। এটি হাইপারসনিক ওয়ারহেডযুক্ত এবং রাশিয়ার ‘ইস্কান্দার’ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।
সিউলের কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের গবেষক হং মিন বলেন, এবারের প্যারেডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র বা ড্রোনসহ বিভিন্ন মানববিহীন যুদ্ধযান উন্মোচন করতে পারে পিয়ংইয়ং। ‘এইবার প্রদর্শিত অস্ত্রের সক্ষমতা হবে অভূতপূর্ব,’ বলেন তিনি।
তবে হাওসঙ-২০ এর পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ না হওয়ায় সেটি প্রদর্শিত হবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত।
উত্তর কোরিয়ার সামরিক প্যারেড মানেই গোপনীয়তা ও কঠোর নিরাপত্তা। দেশটিতে গণমাধ্যমকর্মী ও বিদেশিদের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। ১০ বছর আগে এমনই এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সিএনএন-এর সাংবাদিক উইল রিপলি জানান, তখনও কেউ জানত না কখন প্যারেড শুরু হবে। ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর হঠাৎ নির্দেশ আসত, এবার যাওয়া যাবে,’ বলেন তিনি।
বিদেশি অতিথিদের রাখা হতো তায়েডং নদীর মাঝের ইয়াংগাকদো হোটেলে—যেখান থেকে তারা পিয়ংইয়ং দেখতে পেলেও বাইরে বেরোনোর অনুমতি পেতেন না। অনুষ্ঠানে প্রবেশের আগে একাধিক নিরাপত্তা তল্লাশি পেরোতে হতো, ফোন ও ল্যাপটপ জমা দিতে হতো।
রিপলি জানান, ‘প্যারেড শুরু হতেই হাজারো মানুষ একসঙ্গে কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। সৈন্যদের একসঙ্গে পদচারণার শব্দ যেন এক ছন্দময় আওয়াজ তৈরি করেছিল।’
সম্প্রতি কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের বিশেষ সামরিক সম্পদগুলো সেই লক্ষ্যগুলোর দিকে নির্দেশ করেছি, যেগুলো আমাদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু।’
দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, কিমের ‘বিশেষ সম্পদ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে উন্নত কৌশলগত অস্ত্র ব্যবস্থা- যার মধ্যে থাকতে পারে ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাইবার যুদ্ধ প্রযুক্তি।
তার বিশ্লেষণ, এই বক্তব্য সরাসরি ইঙ্গিত করছে যে দক্ষিণ কোরিয়ার মার্কিন ঘাঁটিগুলোও উত্তর কোরিয়ার হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
তবে কিম সম্প্রতি এক ভিন্ন সুরে বলেন, তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘সুন্দর সম্পর্কের স্মৃতি’ মনে রেখেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের শর্ত তুলে নিলে আলোচনায় বসতে আপত্তি নেই।
এই মাসের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আঞ্চলিক নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন- এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (এপেক) বৈঠক। এতে অংশ নেবেন ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ফলে আবারও কিম ও ট্রাম্পের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্প নিজেই সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমি তার (কিমের) সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমাদের আবারও আলোচনা হবে, সম্পর্ক আরও ভালো হবে।’
সূত্র: সিএনএন
পতাকানিউজ/এনটি

