বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ মোবাইল, গাড়ি এবং স্থাপনার ডিজাইন দেখলে একধরনের মিল চোখে পড়ে। কোথাও বাঁকানো প্রান্ত, কোথাও ধাতব ঝলক, আবার কোথাও কাঁচের প্রাচুর্য সবকিছু যেন এক থিমে তৈরি। অথচ এক দশক আগেও প্রতিটি ব্র্যান্ড কিংবা স্থাপত্য নকশায় ছিল নিজস্বতা, আলাদা স্বাক্ষর। তাহলে কেন এখন এই ডিজাইনের পরিবর্তন? কেন নতুনত্ব হারাচ্ছে আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তি ও স্থাপত্য?
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত মান এবং বাজার প্রতিযোগিতা এই একঘেয়েমির অন্যতম কারণ। মোবাইল ফোনে ‘বেজেললেস ডিসপ্লে ক্যামেরা সেন্টার মডিউল কিংবা গ্লাস ব্যাক এসব এখন শিল্পমান হয়ে গেছে। নির্মাতারা নিরাপদ পথে হাঁটতে চায়, কারণ ব্যর্থ ডিজাইন মানে কোটি ডলারের ক্ষতি। তাই সবাই অনুসরণ করছে ‘ট্রেন্ড’, সৃজনশীলতার বদলে বেছে নিচ্ছে স্থিতিশীলতা।
তবে এক দশক আগের চিত্র ছিল ব্যাতিক্রম, একেকটি মোবাইল ফোন ছিল একেকটি শিল্পকর্ম, নোকিয়া , স্যামসাং, ব্লাকবেরি, htc , সনি ইরেক্সন, এই ধরনের মোবাইল ফোন গুলো একটির সাথে আরেকটির যেমন মিল নেই তেমনি প্রজুক্তি ও ব্যাবহারেও ছিল ভিন্নতা। কোনটি স্লাইডিং, কোনটি ফলডিং, কোনটি আবার বাঁকানো যেত। আবার কিছু কিছু মোবাইলের ডিসাইন এখন পর্যন্ত রয়েছে মানুষের পছন্দের তালিকায়। নোকিয়া ১১০০ এই মডেলের নাম শুনেনি এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুষ্কর।
একই চিত্র গাড়ির ক্ষেত্রেও। এয়ারডাইনামিক্স ও ফুয়েল এফিশিয়েন্সি বাড়ানোর জন্য গাড়ির গঠন এখন প্রায় একই রকম। অতিরিক্ত বাঁক বা ব্যতিক্রমী কাঠামো মানে বেশি বাতাস প্রতিরোধ ও জ্বালানি খরচ , তাই গাড়ি ডিজাইনে বৈচিত্র্য কমে গেছে। ফলে জার্মান, জাপানি কিংবা কোরিয়ান গাড়িগুলোর মধ্যেও বাহ্যিক মিল দেখা যায়।
স্থাপত্যেও এসেছে অনুরূপ পরিবর্তন। আগে যেখানে স্থাপনার নকশায় ছিল সংস্কৃতি, অঞ্চল ও প্রকৃতির প্রভাব, এখন সেখানে এসেছে বাণিজ্যিক বাস্তবতা। কাচ-ইস্পাতের উঁচু ভবন বিশ্বব্যাপী আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যার ফলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। স্থপতিরা বলছেন, প্রতিটি শহর এখন একে অন্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে
তবে ডিজাইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে কেবল একঘেয়েমি নয়, বরং ‘মিনিমালিজম যুগের বাস্তবতা’ বলে মনে করেন। তাদের মতে, এখনকার ডিজাইনগুলো সাদামাটা, কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব হতে চায়। ফলে অতিরিক্ত অলংকার বা ব্যতিক্রমিতা পরিহার করা হচ্ছে সচেতনভাবে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায় যেখানে প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার যুগ চলছে, সেখানে কেন নান্দনিক ভিন্নতা হারিয়ে যাচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ডিজাইনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। হয়তো আগামী দিনে আবার ফিরে আসবে সেই বৈচিত্র্য যেখানে প্রতিটি মোবাইল, গাড়ি ও স্থাপনা হবে একেকটি শিল্পকর্ম।
পতাকানিউজ/এমএফ

