ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রাম বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। একই গ্রাম থেকে পৃথক তিনটি সংসদীয় আসনে তিনজন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস, কৌতূহল এবং নতুন প্রত্যাশা।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিজয়ী হয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। একই দলের প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে জয় পেয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
অন্যদিকে নগরভিত্তিক চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, খুলশী ও পাহাড়তলী) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন সাঈদ আল নোমান। তিনজনেরই স্থায়ী ঠিকানা রাউজানের গহিরা গ্রামে হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
গ্রাম একটি : আসন ভিন্ন
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক; তাঁরা চাচা-ভাতিজা। হুম্মাম কাদের চৌধুরী প্রয়াত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।
গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম কাদের গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা। তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে একই গ্রামের আরেক প্রান্তে সাঈদ আল নোমানের বাড়ি। তিনি বিএনপির প্রয়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে।
ফল ঘোষণার পর গ্রামে উৎসবের আমেজ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই গ্রামে আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করছে। বাসিন্দারা বিষয়টিকে নিজেদের জন্য গর্বের বলে উল্লেখ করছেন।
গহিরা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, একই গ্রাম থেকে একসঙ্গে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বিরল ঘটনা। তাঁর মতে, এই অর্জন গহিরাকে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুনভাবে পরিচিত করেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে গ্রামের উন্নয়ন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে।
রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ গহিরা
স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে গহিরার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়ি এই গ্রামে। তিনি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা।
এছাড়াও বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর আবদুল্লাহ আল হারুন এই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। গহিরার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের, যেমন কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী চৌধুরী মহিবুল হাসান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী।
উন্নয়নের প্রত্যাশা
রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, একই গ্রামের আরও দুইজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, সমন্বিত উদ্যোগে এলাকার উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল্লাহ আল নোমানের কবর গহিরা গ্রামে অবস্থিত। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এলাকায়। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার পাশাপাশি গ্রামের উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
গহিরা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রায়হান মাহমুদ বলেন, এক গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তিনি আশা করেন, তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে এলাকার শিক্ষা, অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী এই গ্রাম এবার জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে স্থানীয়দের মত। একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় গহিরা এখন নতুন প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের আশা—নতুন প্রতিনিধিদের হাত ধরে শুধু সংসদীয় আসন নয়, নিজ গ্রামও উন্নয়নের নতুন ধাপে পৌঁছাবে।
-পতাকানিউজ

