এক ছাদের নিচে প্রতিদিন এক হাজার রোজাদার মুসল্লি ইফতার করছেন। এক প্লেটে এক সঙ্গে চার জন পাশাপাশি বসে মিলেমিশে সেই ইফতার ভাগাভাগি করছেন। তাও আবার একদিন-বা দুদিন নয়। দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে চলে আসছে এ রেওয়াজ। অর্থাৎ প্রতি রমজান মাসের চিত্র এমন। সম্প্রীতির এ পরিবেশের দেখা মিলে বগুড়া শহরের স্টেশন রোডে অবস্থিত বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে। এখানে ধনী-গরিব, শ্রেণি ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে হাজারো মানুষ ইফতারে মিলিত হন। তবে কেউ কাউকে চেনেন না। অথচ পাশাপাশি বসে ইফতার করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে. মসজিদটি নির্মাণ করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর গত ৩০ জানুয়ারি তিনি এ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। সেই মসজিদে দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পবিত্র রমজান মাসে নিয়মিত ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে ।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেলে জোহরের নামাজের পর থেকে মসজিদে স্বেচ্ছাসেবীদের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। স্বেচ্ছাসেবকেরা প্লেটে ইফতারসামগ্রী সাজাতে শুরু করেন আসরের নামাজের পর। প্লেটে খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজু, মুড়ি, বেগুনি, জিলাপি, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি ও শরবত থাকে। ইফতারের আধা ঘণ্টা আগে থেকেই মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে বসতে শুরু করেন। ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মুসল্লিদের হাতে হাতে ইফতারির প্লেট তুলে দেন মসজিদের খাদেম ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত রোজাদারদের হাতে প্লেট পৌঁছে দেয়া হয়। মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ইফতার।
মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন দেড় মণ সুগন্ধি চাল এবং এক মণ সবজি লাগে। সপ্তাহে দুদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি গরুর মাংসের বিরিয়ানি রান্না করা হয়। এজন্য বাবুর্চি নিযুক্ত করা আছে। বিরিয়ানির সঙ্গে ছোলা, বুন্দিয়া, জিলাপি, খেজুর, মুড়ি, তরমুজ ও শরবত দেয়া হয়। রমজান শুরুর আগেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিরা ইফতার তহবিলে সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিদের অনুদানে তহবিলে এবার প্রায় চার লাখ টাকা জমা হয়েছে।
১৯ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে রোজাদারদের জন্য ইফতার আয়োজন করা হচ্ছে জানিয়ে মসজিদের খাদেম মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় এ উদ্যোগ চলে আসছে। এতে শুধু রোজাদারদের সেবা হচ্ছে না; ধনী-গরিব একসঙ্গে ইফতারের মাধ্যমে রোজার প্রকৃত শিক্ষা নিজেকে আত্মশুদ্ধি করা ছাড়াও সাম্য প্রতিষ্ঠা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধের অনন্য উদাহরণ তৈরি হচ্ছে।
মসজিদে ইফতার করতে আসা রিকশাচালক মোহন সাকিদার (৬৫), আজাহার মিয়া (৫৫) বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে যে উপার্জন হয় সেখান থেকে ভালোমানের ইফতার করতে গেলে ১০০ টাকা চলে যায়। তাই এখানে যেহেতু বিনামূল্যে ইফতার করা যায় এজন্য এখানে আসা।’
সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী হাসান ইমাম বলেন, ‘মেসে থাকি। প্রতিদিন এ মসজিদে বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করতে আসি। এখানে এক প্লেটে চার জন ভাগাভাগি করে ইফতার করার অনুভূতি অন্য রকম। এটা শুধু একসঙ্গে ইফতার নয়; পারস্পরিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।’
শাহিনুর ইসলাম জানান, আমরা বন্ধুরা মিলে এখানে ইফতার করি। এটা খুব ভাল একটি উদ্যোগ।
মুদি দোকানি কামাল উদ্দিন বলেন, ‘যাদের ইফতারি করার মতো সামর্থ্য নেই তারাও এখানে এসে ইফতার করতে পারেন।’
মসজিদ কমিটির সদস্য মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘২০০৮ সালে বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল জামে মসজিদে নামাজ আদায় শুরু হয়। ওই বছরের রমজান মাস থেকেই মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে একসঙ্গে ইফতার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই হিসেবে ১৯ বছর ধরে মসজিদে ইফতারের আয়োজন চলছে। তবে মাঝে মহামারি করোনার কারণে দুবছর আয়োজন বন্ধ ছিল।’
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘১৯ বছর ধরে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় এই আয়োজন চলছে।’
পতাকানিউজ/পিএম/আরবি

