আর মাত্র এক বছর পরই তার অবসরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু বিধি বাম। তার আগেই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো পরপারে। ছিনতাইকারির কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রাণ হারান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চোখের চিকিৎসক দেখাতে রনজিনা পারভীন শুক্রবার, ২৭ আগস্ট স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বাসে বগুড়া থেকে ঢাকায় রওনা হন।
গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে রিকশায় করে তিনি হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে আসতেই একটি মোটরসাইকেলে এসে রিকশার পেছন থেকে ব্যাগ ধরে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় তিনি রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। এসময় তার মাথা ফেটে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিনা পারভীন (৫৫) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তার স্বামীর বাড়ি গাবতলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের দাড়াইল বাজারে। তিনি স্বামী ও একমাত্র কন্যাসন্তানসহ বগুড়া মহানগরের পিটিআর মোড়ে বসবাস করতেন।
তার স্বামীর নাম মতিউর রহমান মতিন। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। বগুড়া শহরের নিউ মার্কেটে তার কাপড়ের ব্যবসা রয়েছে । তার একমাত্র কন্যাসন্তান রাইশা মনি। ১৪ বছর বয়সী রাইশা মনি বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
রনজিনা পারভীনের ভাই জাহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৯১ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন রনজিনা পারভীন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল। আর মাত্র এক বছর পরই তাঁর অবসর নেওয়ার কথা ছিল।
জাহিদুল ইসলাম জানান, ৪ ভাই ৫ বোনোর মধ্যে রনজিনা পারভীন দ্বিতীয়। তার বাবার নাম ময়েজ উদ্দিন সরকার। গাবতলী উপজেলার মহিষবাতান ইউনিয়নের দড়ি সোনাকানিয়া গ্রামে তার বাবার বাড়ি।
স্বজনরা জানান, রনজিনা পারভীনের মৃত্যুতে তার পরিবারের সদস্যরা গভীরভাবে শোকাহত। বিশেষ করে তার কিশোরী কন্যা রাইশা মনি মাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছে।
বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরকারী শিক্ষিকা ও সহকর্মী রিজবোনা আকতার জানান, ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে আমরা ৬ জন শিক্ষিকায় স্কুলে গিয়ে মিলাদ মাহিফিলে অংশ নেয়। পরে তার অনুরোধেই আমরা সবাই মিলে তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তুলি। যেটি তার কাছেই আছে। তখন তিনি বলেছিলেন, শুক্রবার রাতে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবেন। তারপর সবাই এক সঙ্গে বের হয়ে যে যার মতো বাড়ি ফিরে যান । মাঝে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু আজকে খবর পেলাম তিনি আর নেই।
তিনি বলেন, তিনি শুধু আমাদের প্রধান শিক্ষিকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক, সহকর্মী ও একজন দক্ষ শিক্ষানুরাগী মানুষ।

গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম জানান, রনজিনা পারভীন খুব দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষিকা ছিলেন। তার মতো শিক্ষক এ সময়ে পাওয়া দুস্কর।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান জানান, আমার কাছে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি জানতাম তার পায়ে চোট লেগেছে। সেখান থেকেই চোখে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য তিনি ঢাকায় চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়েছেন। আজ এমন দু:খজনক ঘটনা ঘটল। প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত।
পতাকানিউজ/পিএম/আরবি

