বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৬ নম্বর আসন হলো চট্টগ্রাম-৯ আসন (কোতোয়ালি-বাকলিয়া)। যেটিকে ভিআইপি আসন হিসেবেও দেখা হয়। আর এ আসনটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য খুবই কৌশলগত এবং প্রতীকী একটি আসন। এ আসনে মনোনয়ন নিয়ে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন, কোন্দল এবং দৌড়ে দেখা গেছে বেশ কিছু হেভিওয়েট নেতাকে। এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন তারা।
কারণ ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকে যে দল এ আসনে জয়ী হয়েছে, সেই দলই সরকার গঠন করেছে। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে এমনটিই ঘটেছে। শুধু তা নয় এই আসনের সাংসদ মন্ত্রিসভায়ও থাকেন। অনেকে বলেন, এটি সম্পূর্ণ কাকতালীয় ঘটনা। কিন্তু এ আসনের মর্ম বুঝেন খোদ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।
গত ৩ নভেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৩৭টি আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই সময় দলটির তালিকায় চট্টগ্রাম-৯ আসনে কোনো প্রার্থীর নাম না থাকলেও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে আবার তা বাতিল করাও হয়।
তবে এতে বিচলিত নন এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাওয়া প্রার্থীরা। তাই এবার এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে সবচেয়ে বেশি দৌড়ঝাঁপ চলছে। বিশেষ করে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা এই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এদিকে জামায়াতে ইসলামী আগেভাগেই প্রার্থী ঠিক করে ফেলায় তিনি একা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
চট্টগ্রাম-৯ আসনের জন্য বিএনপির প্রার্থীর পদ এখন আলোচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেতে তৎপর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম, বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ানের নাম আলোচনায় আছে শীর্ষে। মনোনয়ন ঘোষণার পর আবার স্থগিত হওয়ায় তার প্রার্থিতা নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। ওই আসনের ভোটারদের ধারণা, লবিংয়ে প্রথমে মিললেও ভোটে জয়-পরাজয়ের হিসেব-নিকেশ বিবেচনায় তিনি বাদ পড়ে যান। তবে তিনি আশা ছাড়ছেন না। চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপরে তিনি আশাবাদী।
এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী আবু সুফিয়ান বলেন, আমি নগর ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম। নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম। কোতোয়ালি আসনে সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান দুবার নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। তার নির্বাচনে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম।
এর আগে ২০১৯ সালের উপ-নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী- চান্দগাঁও) আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
এদিকে, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম আসনটিতে চষে বেড়াচ্ছেন। দলবল নিয়ে গণসংযোগ করছেন। তবে তিনি এখনো দলের পক্ষ থেকে কোনো আশানুপ সাড়া পাননি। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ায় রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও বেশ রয়েছে তাঁর। এছাড়া অভিজ্ঞতাও। তিনি জানিয়েছেন, বিএনপির রাজনীতি করার কারণে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার তার পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করে দিয়েছে। তারপরও তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন। এছাড়া দলের মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছেন।’
শামসুল আলম বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে আছি। আর এক বছর আগে থেকে গণসংযোগ করছি। আমার দেখাদেখি অন্যরা গণসংযোগ করছেন। ১৬ বছরে ২২টি মামলার আসামি হয়েছি। জেলও খেটেছি। তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ বহিরাগতদের এনে গণসংযোগের নামে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তবে কেন্দ্র সবকিছু বিবেচনা করে যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেবে।’
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এরমধ্যে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করতে লন্ডন যেতে দেখা গেছে। তবে তিনি দলীয় মনোনয়ন বিষয়ে এখনো মুখ খোলেননি। সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে নগরে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর দলটির পুরাতন নেতা হিসেবে স্থানীয় সমর্থন রয়েছে। স্থানীয়ভাবে আলোচনায় তাঁর নাম থাকলেও দলীয় কোন স্থরে তাঁর মনোনয়নের বিষয়টি লক্ষ্যণীয় ছিল না। তিনিও জানিয়েছেন, দল যদি মনোনয়ন দেন তবে দলের হয়ে নির্বাচন করবেন।
আবুল হাশেম বক্কর বলেন, দলের সবচেয়ে দুঃসময়ে আমি নগর বিএনপির হাল ধরেছি। কোতোয়ালি থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। যখন পুলিশ কাউকে দাঁড়াতে দিত না তখন ডা. শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে আমি সব সময় রাজপথে পুলিশের সঙ্গে লড়াই করেছি। ১৬ বছরে ৮৬ মামলার আসামি হয়েছি। সাতবার জেলে গেছি। দলীয় কর্মীদের জন্য যা যা করা দরকার সবকিছুই করেছি। দল যদি আমাকে বিবেচনা করে অবশ্যই আমি এর সদ্ব্যবহার করব। ভোটাররাও আমাকে মূল্যায়ন করবে।
দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, চট্টগ্রাম-৯ আসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি জায়গায় তারা এমন প্রার্থী চায় যিনি শুধু জেতার সক্ষমতা রাখে না, বরং দলে ঐক্য বজায় রাখতে পারে। যে প্রার্থীর ন্যূনতম কোন্দল কম এবং দলে স্বীকৃতি বেশি, তাকে শেষ মুহূর্তে বেছে নিতে পারে।
এই আসনে বিএনপি জেতার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতীকগত গুরুত্ব বেশি। এটি শুধু একটি আসন নয়, সমর্থন বা প্রভাব দেখানোর জায়গা। যদি মনোনয়ন স্থগিত থাকে, তাহলে সুফিয়ান সমর্থকরা দমে যেতে পারে না এবং তারা দলে চাপ বাড়াতে পারে। অন্য দিকে, যদি দলে শান্তি ও ঐক্য প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশোধিত মনোনয়ন তালিকা আসতেই পারে।
১৯৯১ সালে আবদুল্লাহ আল নোমান এই আসন থেকে বিএনপির টিকিটে বিজয়ী হয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও তিনি অপরিবর্তীত থাকেন। কিন্তু একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান বিজয়ী হয়ে মন্ত্রী হন। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান ফের বিজয়ী হয়ে হন খাদ্যমন্ত্রী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে হন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টির জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু বিজয়ী হন এখানে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম-৯ আসনে চিকিৎসক এ কে এম ফজলুল হককে প্রার্থী করেছে, যিনি এলাকায় মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছেন। তিনি ভোটারদের সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে জামায়াতকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এনসিপি দলটি থেকে এ আসনে কে মনোনয়ন পাচ্ছে তা এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি।
পতাকানিউজ/আরএস/কেএস

