বাংলা সিনেমার তখন স্বর্ণযুগ। বিজ্ঞাপনে ‘সিলেটে চিত্রায়িত…’ বলেই যেন সিনেমা হিট! ষাটের দশক থেকে নব্বই দশক এভাবেই চলেছে। ‘এপার-ওপার’, ‘বানজারান’ থেকে ‘চাঁদনি’ সিনেমার শ্যুটিং স্পট একটিই। নাম- রাংপানি। এরপর বাংলা সিনেমার ফ্লপকাল শুরু; আর রাংপানি খুবলে খাওয়া শুরু। খেতে খেতে শেষে ‘অক্কা পাওয়া’র পর রক্ষায় নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা।
সাদা পাথর, জাফলং এলাকায় পাথর লুটপাটের তথ্য-তালাশের মধ্যেই গণমাধ্যমের চোখ পড়ে রাংপানিতে। ১৮ আগস্ট ও ১৯ আগস্ট টানা দুদিন সংবাদ শিরোনাম রাংপানি। অতঃপর টনক নড়ে স্পটের নিয়ন্ত্রক বিজিবির। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, রাংপানি বিজিবির নিয়ন্ত্রণে। এরপর সরেজমিনে গিয়ে সেখানে দেখা গেছে, সব সুনসান। বিজিবির সতর্ক পাহারা চলছে। অথচ তিন-চারদিন আগেও সেখানে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক দেখে পাথরখেকোরা দা উঁচিয়ে তেড়ে এসেছিলো।
রাংপানি একটি নদীর নাম। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীপুর পাথরমহালের নদীটির এপারে বাংলাদেশে, ওপারে ভারত। সিলেটের অন্যান্য পাথরমহালের মতো এখানেও ইজারা বন্দোবস্ত বন্ধ রয়েছে। শ্রীপুরের পাশে রাংপানি নামক স্পটটির পর্যটন পরিচিতি বেশ পুরোনো। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত সেখানে চিত্রায়িত হয়েছে অসংখ্য বাংলা সিনেমা। পাহাড় পাদদেশ ও জলপাথরের ছবি সিনেমার রূপালি ফিতায় এখনো মূর্ত হয়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী পর্যটন স্পটটি সুরক্ষিত না থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছিলো। তবে সাদাপাথরে পাথর লুটেরাদের বিরুদ্ধে যেদিন থেকে অভিযান শুরু হয়, সেদিন থেকে রাংপানিতে লুটের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীপুর রাংপানি জিরো পয়েন্ট অনেকটা পাথরহীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে জিরো পয়েন্টের দক্ষিণ দিকে সব পাথর লুট করে নিয়েছে পাথরখেকোরা। দক্ষিণ দিকে এখন শুধু পানি। জিরো পয়েন্টের উত্তর দিকে পাহাড়ের ঢাল কেটে বড় বড় পাথর তোলা এখন চলমান আছে। গত রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় তিনঘন্টা সেখানে অবস্থান করে দেখা যায়, প্রকাশ্যে শতাধিক শ্রমিক পাথর লুট করছে। সকাল থেকেই একদল শ্রমিক রাংপানি জিরো পয়েন্টের উত্তর দিকে বড় পাথরগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভাঙ্গছে। আরেকদল সেই পাথর নৌকায় তুলে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। তারা যেখান থেকে পাথর লুট করছেন, সেখানে একবার বিজিবির একটি টহল দল এসে বাঁশি বাজায়। কিন্তু কোনো তোয়াক্কা না করে পাথর তোলা চলমান রাখে শ্রমিকরা। এরপর চলে যায় বিজিবি।
যেখানে পাথর লুট করা হচ্ছে সেখানে সাংবাদিক গেলে তারা কখনো পাথর নিক্ষেপ করে, আবার কখনো তাদের সঙ্গে থাকা পাথর ভাঙা ও উত্তোলনের সরঞ্জাম দিয়ে হামলা চালায়। রাংপানি থেকে লুট করা পাথরগুলো স্পট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরেই স্তূপ করে রাখতেও দেখা যায়। আশপাশের বাসিন্দারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে পাথর লুট হচ্ছে। আগে লুটপাটের নিয়ন্ত্রক ছিলেন জৈন্তাপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের মেঘালয়ে তার শ্বশুরবাড়ি চলে যান। সেখানে অবস্থান করে লিয়াকতের মাধ্যমে নতুন নিয়ন্ত্রক তৈরি করে পাথর লুট চলছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, নতুন নিয়ন্ত্রকের অধিকাংশ পাথরব্যবসায়ী ও বিএনপি-জামায়াত রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা লিয়াকত ভারত থেকে ফোনে যোগাযোগ করে নতুন কারবারি নিযুক্ত করায় গত একমাস ধরে লুটের পরিমাণ বেড়ে গেছে। সাদাপাথরের মতো এখানেও পাথর ব্যবসাসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদেরও প্রশ্রয় রয়েছে। সীমান্তবর্তী পাহাড় কেটেও পাথর তোলা হচ্ছে। কিন্তু পাথর লুট বন্ধে প্রশাসনের ধারাবাহিক কোনো নজরদারি নেই। বিজিবিও অনেকটা গাছাড়া ছিল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ মেয়াদে এখানে লুটপাটের নেতৃত্ব দিতেন দলের উপজেলার সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা। গণ-অভ্যুত্থানের পর নেতৃত্বে এসেছেন তার আপন দুলাভাই আব্দুল আহাদ। শালা-দুলাভাই মিলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত করে ছেড়েছেন শ্রীপুর থেকে রাংপানি পর্যন্ত।

লুটের শুরু, নাটের গুরু
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শেষ সীমায় শ্রীপুরের অবস্থান। ভারত অংশ থেকে বাংলাদেশে নেমে এসে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরের আধা কিলোমিটার এলাকা নিয়ে শ্রীপুর পাথরমহাল। সেখান থেকে আদর্শগ্রাম ঘাট (বাননগাফ) থেকে নদীর নিচের অংশ পর্যন্ত এলাকা হচ্ছে রাংপানি। আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ। এই পুরো এলাকায় বেপরোয়া পাথর উত্তোলন চলছিলো দীর্ঘদিন ধরে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে রাংপানিতে সরেজমিন গিয়ে ‘পাথর লুটেরার খপ্পরে পড়ে বিবর্ণ রাংপানি নদী’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন করেছিলেন সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী। পতাকানিউজকে তিনি বলেন, ‘তখন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত আলীর। একটি ট্রাকে করে পাথরের কারবারি সেজে সেখানে গিয়ে লুকিয়ে কয়েকটি ছবি তুলতে সক্ষম হওয়ায় রিপোর্টটি করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর অন্তত তিন বছর আর জৈন্তাপুর-শ্রীপুর যাওয়া হয়নি।’
সিলেটের এই সাংবাদিক আরও বলেন, ‘একটা সময় সিলেটের পর্যটন বলতে জাফলং ও শ্রীপুরই বোঝাতো। পাশাপাশি বাংলা সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবেও এর খ্যাতি ছিল। সব খ্যাতি পাথর লুটেরাদের দৌরাত্ম্যে মারা গেছে। এখন অবশ্য অক্কার পর রক্ষা বলা যায়।’
শ্রীপুর ও রাংপানির পাথর পাথরগুলো আকারে অনেক বড় ও কিছুটা লালচে রঙের। সেখান থেকেই স্থানীয়ভাবে এটি ‘রাঙা’ পাথর নাম পেয়েছে। বড় আকারের পাথর হওয়ায় এগুলো বহন করা সহজ নয়। যে কারণে পাথর লুটের আগে সেটিকে নিজস্ব ফর্মুলায় ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয়ভাবে এই ভাঙার পদ্ধতিকে বলা হয় ‘বিস্ফোরণ’।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশাল আকৃতির এসব পাথরের নিচে প্রথমে আগুন জ্বালান শ্রমিকরা। কাঠ, বাঁশের টুকরাসহ নানান উপাদন দিয়ে আগুন ধরানো হয়। ১০ থেকে ১২ মিনিট আগুন জ্বালালে তার তাপে পাথরে ফাটল ধরে। তখন বড় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলেই পাথর সহজে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। তখন সহজে বহন করে নৌকায় তুলে নিয়ে যায় লুটেরারা। এভাবে দিনরাত পাথর তুলে ভাঙা হচ্ছে। তারপর নৌকায় করে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। শ্রীপুর ও রাংপানির এসব পাথর যায় স্থানীয় আলুবাগান ও ৪ নম্বর বাংলাবাজারের ক্রাশার মিলগুলোতে। এসব মিলের পাথরের মাত্র ১০ শতাংশ এলসির আমদানি করা, বাকি ৯০ শতাংশই শ্রীপুর ও রাংপানির পাথর।
নয়া চক্র ‘শালা-দুলাভাই’
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অনুসন্ধানে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এখানে তাদের নেতাদের মদদে ও নেতৃত্বে পাথর লুট হয়েছে। আওয়ামী লীগের সময়ে মূলত পাথর লুটে সামনে নেতৃত্ব দিয়েছেন জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক রাজা। আর নেপথ্যে ছিলেন সিলেট-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ, জৈন্তাপুর উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ও তাঁর দুই ভাই- উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কামাল আহমদসহ প্রভাবশালীরা। তাদের মদদে আব্দুর রাজ্জাক রাজা বেপরোয়া পাথর লুট শুরু করেন।
৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলেও শ্রীপুর পাথরমহালের ভাগ্য বদলায়নি। লুটেরাচক্রের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও আরও বেপরোয়াভাবে শুরু হয় পাথর লুট। এবার আব্দুর রাজ্জাক রাজার জায়গায় কর্তৃত্ব বুঝে নেন তারই আপন দুলাভাই আব্দুল আহাদ। তার সাথে কথা বলতে মোবাইল ফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুর রাজ্জাক রাজা বলেন, ‘প্রথম কথা হলো, আমি এলাকাতেই নেই, তাহলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে কেন? তাছাড়া এখন যেখান থেকে পাথর তোলা হচ্ছে, সেটা তো বাংলাদেশের এলাকা নয়; ভারতের এলাকা।’ আওয়ামী লীগের আমলে সম্পৃক্ত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সত্য নয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাথর তোলার বৈধতা ছিল।’
জৈন্তাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা আক্তার লাবনী বলেন, ‘সোমবার সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত আমরা তিনটি স্পটে অভিযান চালিয়েছি। বাংলাবাজার স্পটে নিলাম হয়েছে ৩৫ ট্রাক বালু। বাকি দুই স্পটের ক্রাশার মিল থেকে সাড়ে ৯ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। পাথর তুলছে নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে। বিজিবির ক্যাম্প ওখানে আছে। বিজিবির অধীন এলাকা এটি। আজকের অভিযানে বিজিবির ক্যাম্প কমান্ডার আমাদের সঙ্গে ছিলেন।’
বিজিবির নিয়ন্ত্রণ
শ্রীপুর-রাংপানি ৪৮ বিজিবির অধীন। সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘রাংপানি সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আমাদের টহলও বাড়ানো হয়েছে। মূলত রাংপানি বাংলাদেশ সীমান্তে এখন কোনো পাথর নেই। যখন এখানে কোয়ারি ছিল, তখনই সে জায়গার সব পাথর তুলে ফেলা হয়েছিল। বর্তমানে রাংপানি বাংলাদেশ সাইডে শুধুই পানি।’
রাংপানি জিরো পয়েন্ট কঠোর নিরাপত্তায় থাকবে জানিয়ে ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক বলেন, ‘শূন্যরেখার যে জায়গা থেকে গতকাল পাথর উত্তোলন করা হচ্ছিল, সে জায়গায় আজ কেউ ছিল না।’
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরই দৃশ্যপট বদলেছে জানিয়ে অধিনায়ক আরও বলেন, ‘যে শ্রমিকরা পাথর তুলছিলেন সেটা ইন্ডিয়ার অংশ। রাংপানিতে যে ঝর্না আছে, সেটাও ইন্ডিয়াতে পড়েছে। সেখানে যাওয়া যায় না।’
পরিবেশ, ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য হেরিটেজ’-এর প্রধান নির্বাহী আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, ‘প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রের একমাত্র সুরক্ষা হচ্ছে সেখানকার প্রকৃতিকে অবিকল রাখা। লুটপাটে বিবর্ণ রাংপানি আগের রূপে ফেরানো সম্ভব নয়। তবে এখন যেভাবে নজরদারির মধ্যে সংরক্ষিত আছে, ঠিক এভাবে রাখতে পারলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ফিরে আসবে। কোনো প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নেই।’
পতাকানিউজ/টিআর

