এরশাদের শাসনামল। পুরো দেশে তখন ‘স্বৈরাচার হঠাও’ আন্দোলন তুঙ্গে। তবে এ নিয়ে এরশাদের তেমন কোনো উদ্বেগ উৎকন্ঠা ছিল না। আমোদ প্রমোদে তিনি কাটাতেন। ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি সময়। সম্পাদক নিজে দুটি অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন একই দিনে। একটি সকালে, অন্যটি বিকেলে। একটি হচ্ছে কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরির সামনে ‘জিনাত পার্ক’ এর উদ্বোধন এবং অন্যটি নাসিরাবাদ সিঅ্যান্ডবি কলোনিতে ‘পথকলি ট্রাস্ট’ এর উদ্বোধন। দুটো অনুষ্ঠানের যে কার্ড বিলি করা হয়েছে তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে নাম আছে জিনাত হোসেইনের। তিনি জিনাত মোশাররফ নামে তুমুল পরিচিতি পেয়ে যান প্রচার মাধ্যমে। এরশাদের সাথে ঘনিষ্টতা চরমে পৌঁছালে তিনি জিনাত হোসেইন নামে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন।
উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের ( বিসিআইসি) একটি প্রতিষ্ঠান। যেটি শিল্প মন্ত্রনালয়ের অধীন। তখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হচ্ছেন জিনাতের স্বামী একেএম মোশাররফ হোসেন। যিনি এর আগে বিসিআইসির চেয়ারম্যান ছিলেন। বিসিআইসির উদ্যোগে একটি পার্কের নামকরণ শিল্পসচিব তথা বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যানের স্ত্রীর নামে যিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি। আবার পথকলি ট্রাস্টের উদ্বোধনেও তিনি প্রধান অতিথি। এটা নিয়ে বেশ কানাঘুষা হলেও সবাই জানেন জিনাত হচ্ছেন এরশাদের বান্ধবী। এরশাদের প্রশ্রয়ে প্রচণ্ড প্রতাপ তাঁর। ঢাকায় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিনি মন্ত্রী, নেতাদের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেতে থাকেন। কোনো পদ পদবি ছাড়াই তিনি ভিভিআইপি মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পেতে থাকেন। সবাই তাঁকে অঘোষিত ‘ফার্স্টলেডি’ বলে জানেন।
যে দু’টি অনুষ্ঠানের কথা বলছি তার আমন্ত্রণপত্রে বিশেষ অতিথি হিসেবে একাধিক মন্ত্রীর নাম রয়েছে। অনুষ্ঠান দুটিতে উপস্থিত ছিলেন, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু, শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলামসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। রিপোর্টাররা বিভ্রান্ত প্রটোকল নিয়ে। ডেস্কও দ্বিধান্বিত। কিন্তু জিনাতকে হাইলাইট করেই শেষ করতে হল রিপোর্ট। মন্ত্রীদের কারো কোনো আপত্তি নেই। সব জেনেশুনেই তাঁরা জিনাতের পেছন পেছন এসেছেন।
কার্ডে চট্টগ্রামের মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর নাম ছিল। কিন্তু তিনি এতে উপস্থিত ছিলেন না। চটগ্রাম পৌরসভাকে প্রথমে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন এবং পরে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করেন এরশাদ। পৌরসভা বিলুপ্ত করে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন করার পর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান ব্রিগেডিয়ার মফিজুর রহমান। এরপর প্রশাসক হন সেকান্দর হোসেন মিয়া। ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী এরশাদ মন্ত্রীসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। পরে হন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বন্দর-পতেঙ্গা আসনে তিনি আওয়ামী লীগের ইসহাক মিয়ার কাছে পরাজিত হলে রাজনীতিতে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। তখন এরশাদ তাঁকে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার পর প্রথম মেয়র হিসেবে নিয়োগ পান বাঁশখালী আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। জিনাতের অনুষ্ঠান দুটিতে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন বলে এরশাদ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, একথা সম্প্রতি জানলাম মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর কাছ থেকে, ৩৭ বছর পর স্মৃতি হাতড়ে এ লেখার সময় তথ্যাদি পুনঃ যাচাই করতে গিয়ে।
জিনাতের স্বামী এ কে এম মোশাররফ হোসেন একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন বিভিন্ন সেক্টর থেকে মেধাবী ও দক্ষ লোকজন এনে তাঁর প্রশাসন সাজান। এ সময় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন জামাল উদ্দিন আহমদকে, যিনি পরে উপ প্রধানমন্ত্রীর পদে উন্নীত হন। জামাল উদ্দিন নিজেও একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন। তাঁর সুপারিশে মোশাররফ হোসেনকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করেছিলেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেন। জিনাত মোশাররফ তাঁর নজরে পড়েন ১৯৮৬ সালে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। তারপর জিনাত মোশাররফের সাথে গড়ে তোলেন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, যা পরে ব্যক্তিগত সম্পর্কে উন্নীত হয়। জিনাত মোশাররফ সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় যা বলা আছে তা এখানে তুলে ধরছি –
‘জিনাত এ কে এম মোশাররফ হোসেনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৯০ সালে ( এটা ১৯৯৭ হবে) সরকারি মালিকানাধীন দৈনিক বাংলা দাবি করে যে, এরশাদ এবং জিনাত মোশাররফ প্রায়ই বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের মালিকানাধীন অতিথিশালায় মিলিত হতেন। জিনাতের স্বামী এ কে এম মোশাররফ হোসেনকে ১৯৮৮ সালে শিল্প মন্ত্রনালয়ের সচিব হিসেবে এরশাদ সরকারি চাকরি দেয়ার আগ পর্যন্ত মোশাররফ হোসেন কোম্পানির (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সাথে তার (জিনাতের) দীর্ঘ ১৪ বছরের সম্পর্ক ছিল, যা ১৯৯৭ সালে সমাপ্তি ঘটে। এ সংবাদ প্রকাশের পর ১৭ এপ্রিল ১৯৯৭ সালে এ কে এম মোশাররফ হোসেন জিনাতকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পারিবারিক সমস্যা নিরসনে ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ জিনাত মোশাররফ ও তার স্বামীর মধ্যে মধ্যস্থতা করেন।’
উল্লেখ্য, এ কে এম মোশাররফ হোসেন ২০০১ সালে ময়মনসিংহ -৫ ( মুক্তাগাছা) আসন থেকে বিএনপির টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। জিনাত মোশাররফ ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত মহিলা এমপি নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম থেকে।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নয় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, তারপর হাঁ- না ভোটে (গণভোট) রাষ্ট্রপতি পদগ্রহণ, ঘরোয়া রাজনীতি চালু, নিজস্ব দল গঠন এবং বিভিন্ন মতাদর্শের লোকজন নিয়ে ক্ষমতা উপভোগ। আগের লেখায় উল্লেখ করেছি ছাত্রসমাজ ও পেশাজীবীরা শুরু থেকেই এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে। এরশাদ আন্দোলন দমানোর যত কৌশল আছে সবকিছু প্রয়োগ করেছেন। পাশাপাশি চালিয়েছেন বিভিন্ন দল থেকে নেতা ভাগানোর কাজ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি জালাল আহমদ দলছুট হয়ে উপমন্ত্রীর মর্যাদায় হয়ে গেলেন এরশাদের ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি শংকিত হয়ে পড়ায় তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি পদে চাকরি নিয়ে লন্ডন চলে যান। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে।
ডাকসু তখন জাসদ ছাত্রলীগের দখলে। আখতারুজ্জামান ভিপি (পরে আওয়ামী লীগ নেতা) এবং জিয়াউদ্দিন বাবলু জিএস। এরশাদ বিরোধী মিছিল মিটিং শেষে একরাতে তিনি গিয়ে ভিড়লেন এরশাদের সাথে। প্রথমে রাষ্ট্রপতির ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা, পরে এরশাদের মন্ত্রীসভায় উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং পূর্ণমন্ত্রী হন।
জিয়াউর রহমানের সরকারে দুই উপ প্রধানমন্ত্রীর একজন ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করেন। মওদুদও গ্রেপ্তার হন দুর্নীতির একগাদা অভিযোগে। পরে সেই মওদুদকে মুক্তি দিয়ে এরশাদ তাঁর প্রধানমন্ত্রী করেন। এরশাদের পতনের সময় মওদুদ আহমদ ছিলেন উপ রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী, কোরবান আলী এরাও এরশাদের মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। মিজান চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রীও করা হয়। কাজী জাফর আহমদ, আতাউর রহমান খান এরাও এরশাদের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বিভিন্ন দলের নানা মতাদর্শের লোকজন নিয়ে গঠিত জাতীয় পার্টিতে এবং মন্ত্রীসভায় অনেকে স্থান পেয়েছেন রওশনের আশীর্বাদে।
ফার্স্টলেডি রওশন
রাষ্ট্রপতি এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে প্রথমবারের মত সরকারিভাবে ‘ফার্স্টলেডি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একান্ত সচিব, ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহনের মাধ্যমে সরকার, প্রশাসন ও জাতীয় পার্টিতে নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করেন। তিনি ভাগ্য গণনায় বিশ্বাসী ছিলেন। দেখেছি কিভাবে রাখাল আাচার্য নামে চট্টগ্রামের একজন হস্তরেখাবিদ রওশনের ভাগ্য গণনা করতে গিয়ে নিজের ভাগ্যের বদল ঘটিয়েছেন। রওশনের কল্যাণে তিনি জাতীয় পার্টির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সভাপতি পদও পেয়ে যান। এরশাদ পতনের পর এই রাখাল আচার্যও হারিয়ে হান রাজনীতির অতল গহ্বরে।
এরশাদের ভাই জিএম কাদের জানতেন না অনেকে
গোলাম মোহাম্মদ কাদের ( জি এম কাদের) চাকরি জীবনের পুরো সময়টাই কাটিয়েছেন চট্টগ্রামে। চাকরি করতেন যমুনা অয়েল কোম্পানিতে। এরশাদের শাসনামলে তিনি ছিলেন যমুনা অয়েলের মহাব্যবস্থাপক। তখন এটি ছিল কোম্পানির শীর্ষ পদ, এখন যেটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ১৯৯০ সালের দিকে জি এম কাদের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। বিপিসির সদর দপ্তর তখন ছিল আগ্রাবাদে যমুনা ভবনের বিপরীতে একটি ভবনে। বিপিসির সদর দপ্তর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করেন এরশাদ। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ টি বোর্ড সদর দপ্তরও চট্টগ্রামে স্থাপন করেন এরশাদ। এরশাদ শাসনামলে অনেকের উত্থান হয়েছে, অনেকে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন ক্ষমতা বলয়ের কাছাকাছি থেকে। রওশন বা জিনাত লবি ধরেও অনেকে অনেক স্বার্থ হাসিল করেছেন।
এরশাদ শাসনামলের নয় বছরে ব্যতিক্রম ছিলেন জি এম কাদের। এরশাদের আপন ছোটভাই যে চট্টগ্রামে আছেন যমুনা এবং পরে বিপিসির উর্ধ্বতন পদে তা অনেকেই জানতেন না। জি এম কাদেরও কখনো রাষ্ট্রপতি বড়ভাইয়ের পরিচয় ভাঙিয়ে কোনো কিছুই করেন নি, দেখানোর চেষ্টা করেন নি প্রভাব প্রতিপত্তি। এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি হাজির হতেন না তেমন। ভাইয়ের কল্যাণে বিপিসির চেয়ারম্যান পদ পাওয়ার চেষ্টা তদবিরও করেছেন বলে শোনা যায়নি। তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু। জি এম কাদের মন্ত্রীর আনুগত্য মেনে চলেছেন। মোটকথা নিজেকে পাদপ্রদীপের আলো থেকে সযতনে নিজেকে সরিয়ে রাখতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরে সুবিধাবাদী কোনো গোষ্ঠীও তখন গড়ে ওঠেনি। এরশাদের পতনের পর অনেকেই জানতে পারেন। এরশাদের মৃত্যুর পর তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হন।
স্ক্যান্ডাল যখন আড়াল করে অনেক কিছু
এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় থাকাকালে গদি টিকিয়ে রাখতে তেমন কোনো কাজ নাই যা তিনি করেননি। ছাত্র জনতার মিছিলের উপর ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা, নুর হোসেন হত্যা, ডা. মিলন হত্যাসহ দমন পীড়নে রাষ্ট্রীয় সকল বাহিনীকে ব্যবহার করেছেন। এরমধ্যেও তিনি প্রশংসনীয় অনেক কাজ করেছেন। তিনি বহুল প্রশংসিত জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়ন করেছেন, থানাসমূহকে উপজেলায় উন্নীত করে শক্তিশালী উপজেলা পরিষদ গঠন, চট্টগ্রামসহ চারটি স্থানে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়নেও যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। কর্ণফুলী নদীর উপর স্টিল স্ট্রাকচারের প্রথম সড়ক সেতুটি তিনি নির্মাণ করেন নেদারল্যান্ডের সহায়তায়। সেই ব্রিজ পশ্চিম পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। তাঁর ভাল কাজগুলি ঢাকা পড়ে যায় নারী সংক্রান্ত নানান স্ক্যান্ডালের আড়ালে।
আজকে যেখানে মা ও শিশু হাসপাতাল সেখানে হাইকোর্টের বেঞ্চ ছিল। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি এলাকায় এরশাদের ক্যাডারদের হাতে খুন হন বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলন। এরশাদ সেদিন চট্টগ্রামে ছিলেন। তিনি মা ও শিশু হাসপাতালের সমাবেশে যোগ দেন এবং বড় অংকের অনুদান প্রদান করেন। সেখান থেকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আসার কর্মসূচি ছিল এক কোটি টাকার অনুদান দিতে। এরশাদের বিরুদ্ধে তখন গণআন্দোলন তুঙ্গে। ছাত্র জনতা তাঁকে চট্টগ্রামে প্রতিরোধের ঘোষণা দেয়। চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ তাতে একাত্মতা ঘোষণা করে এরশাদের কাছ থেকে অনুদান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে সেই কর্মসূচি বাতিল হয়। মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে তাঁর যাওয়ার কথা ছিল সেনানিবাসে। আগ্রাবাদে থাকতেই তিনি ঢাকায় ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে অন্যসব কর্মসূচি বাতিল করে ঢাকায় ফিরে যান।
ডা. মিলন হত্যাকাণ্ড স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে আরো তীব্র করে তোলে এবং এরশাদের পতন তরান্বিত করতে এটি ছিল টার্নিং পয়েন্ট।
টানা দশদিন বন্ধ ছিল দেশের সকল পত্রিকা
স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের সংগঠন মিলে গঠিত হয় পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ। ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের পর পেশাজীবীরা কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করে। সাংবাদিক সমাজে তখন দলীয় বিভাজন ছিল না। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের আহবানে ২৭ নভেম্বর থেকে সারাদেশে সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিক সমাজ কর্মবিরতি পালনে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত পালন করে। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর আবার সংবাদপত্র প্রকাশ হতে থাকে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে এটি ছিল বিরল ঘটনা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

