ওয়ারেন্টভুক্ত এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হত্যাসহ একাধিক মামলায়ি অভিযুক্ত চট্টগ্রাম মহানগরের চান্দগাঁও থানার ওই ছাত্রদল নেতা।
চান্দগাঁও থানার পাঠানিয়া গোদা এলাকায় টার্ফ মাঠ দখল নিয়ে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর খুন হয়েছিলেন জুবায়ের উদ্দিন বাবু (২৬)। প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুবদল–ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ ৪০ জনের নামে মামলা হয়।
এতে ৩ নম্বর আসামি চান্দগাঁও থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান ওরফে আলফাজ। চলতি বছরের ১৩ জুলাই পলাতক থাকা আলফাজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও দলীয় প্রভাব বিস্তার করে পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আলফাজ। তাকে দেখেও যেন চোখ বন্ধ প্রশাসনের। শুধু বাবু খুনে তার সংশ্লিষ্টতা নয়, কিশোর বয়সে সৎ বোন হত্যা মামলায়ও ৩ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি সে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে সাংবাদিক পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগসহ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ।
এ ঘটনার পর আলফাজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন মহানগর ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ। তবে এখনো একই পদে বহাল তবিয়তে রয়েছে আলফাজ।
বছর পেরিয়েও অধরা আলফাজ
এদিকে হত্যাকাণ্ডের এক বছর পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হয়নি আসামি আলফাজ। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আদালতের পরোয়ানা তোয়াক্কা না করে দলীয় কার্যক্রমে ও এলাকায় অবাধে চলাফেরা করছে আলফাজ। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অপহরণের অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর বিভাগের ডিসি আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যদি প্রপার চ্যানেলে আসে, নিঃসন্দেহে আসামিকে গ্রেপ্তারে উদ্যোগ নেয়া হবে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলে প্রকাশ্যে চলাফেরার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কোনো ব্যক্তি যদি নজরে থাকে অবশ্যই পুলিশকে জানাবেন। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করবে।’
আলফাজের বিরুদ্ধে গত ১৩ জুলাই জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় দেখা গেছে, নিয়ম অনুযায়ীই এ পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। এবং সেটি চান্দগাঁও থানার ওসির কাছেও পৌঁছেছে। পরোয়ানার জারির পরদিন ১৪ জুলাই চান্দগাঁও থানা এটি রিসিভ করে এবং তাতে সিল দেয়।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন চান্দগাঁও থানার সাবেক এসআই সুমন বড়ুয়া। গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সম্প্রতি বায়েজিদ থানায় বদলি হয়েছেন বলে জানান। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান এসআই জায়েদ আব্দুল্লাহ বিন সরোয়ার।
যোগাযোগ করা হলে তিনি পতাকানিউজকে বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কয়েকদিন আগে এই মামলার এক আসামিকে র্যাব গ্রেপ্তার করে দিয়েছে।’
এই মামলায় অন্যতম আসামি ছোট সাজ্জাদ। বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর এ মামলার পরবর্তী শুনানি।
মিছিল-ফেসবুকে সরব আলফাজ
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও দলীয় মিছিল–সমাবেশে আলফাজের সরব অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মিছিল নিয়ে ছুটতে দেখা গেছে তাকে। মিছিলে ব্যানারের বাইরে প্রথম সারি থেকে নেতৃত্ব দেন আলফাজ। এরপর ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নেয় আলফাজ।

শুধু মিছিল বা সমাবেশ নয়, আলফাজকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সরব দেখা গেছে। ১০ আগস্ট তিনি নিজের ছবি পোস্ট করেছেন এমডি আলফাজ নামে ফেসবুক আইডি থেকে। ১২ আগস্ট মীর হেলালকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নিজের ফেসবুক আইডি থেকে। প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন তিনি।
সৎ বোন হত্যা মামলার আসামি
শুধু বাবু হত্যাই নয়, আলফাজ নিজের সৎ বোনকে হত্যার মামলায়ও আসামি। ২০১৩ সালে সৎ বোন রাফিদা আক্তার নিহারকে হত্যার মামলায় তিনি ছিলেন অন্যতম আসামি। তার সৎমা খালেদা আকতার বাদী হয়ে তখন হত্যা মামলা করেছিলেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট আবদুর রহমান ওরফে আলফাজকে প্রধান আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছিল পুলিশ। এখনো সে মামলা বিচারাধীন।
সাংবাদিক পরিবারের ওপর হামলা
শুধু ব্যবসায়ী নয়, সাংবাদিক পরিবারের ওপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে আলফাজের বিরুদ্ধে। গত ২৬ এপ্রিল রাত ৯টায় চান্দগাঁও বিসিক শিল্প এলাকার সামনে থেকে সাংবাদিক আমজাদ হোসাইনের বাবা শফিউল আলমকে তুলে নেয় ছাত্রদল–যুবদলের নেতারা। আধা ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট রাত ১০টায় চান্দগাঁও থানার মালির বাড়ির আবসারের জায়গা দখল করতে যায় সে। এর আগেও ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট বরিশাল বাজারের ব্যবসায়ী রায়হানের বাসা থেকে নগদ টাকা লুট করে আলফাজ ও তার সহযোগীরা। পরে চাঁদা দাবি করলে ভুক্তভোগী রায়হান স্ত্রীসহ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বক্কর নামের এক ভুক্তভোগীর বাড়িঘর ও গাড়ি ভাঙচুর করে আলফাজ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২৯ আগস্ট নিজ বাসা রিয়াজ উদ্দিন উকিল বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেছে আলফাজকে। ৩০ আগস্ট পিজাবিডি নামের রেস্টুরেন্টে নাশতা করতেও দেখা যায় তাকে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকালে স্থানীয়রা তাকে বরিশাল বাজার এলাকায় মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। এছাড়া ছাত্রদলের দলীয় বিভিন্ন কার্যক্রমেও তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই আলফাজ চাঁদাবাজি ও দখলবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে ধরতে তৎপর নয়। অন্যদিকে ছাত্রদলের সিনিয়র নেতারা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও এক বছরেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ছাত্রদলের ‘গোপন’ তদন্ত
সাংগঠনিক ব্যবস্থার বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আলফাজের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। কিন্তু সেদিনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সে ছিল না। এটিই জানিয়েছে আমাদের তদন্ত কমিটি।’
ওই তদন্ত কমিটিতে কারা ছিলেন? সাংগঠনিক কোন প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওটা গোপনে তদন্ত করা হয়েছে। এতে চান্দগাঁও এলাকার স্থানীয়দের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। তবে সংগঠনের প্যাডে কোনো কমিটি অনুমোদন করা হয়নি।’
‘আইনিভাবে মোকাবেলা করছি’
মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান আলফাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি। এ ঘটনায় সাংগঠনিক তদন্তও হয়েছিল। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এ ঘটনা তদন্ত করেছিলেন। এতে আমার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। ভিডিও ফুটেজেও আমাকে দেখা যায়নি। এছাড়া এ ঘটনায় যুবদলের একটি কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছিল।’
এ ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়ায় চান্দগাঁও থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম ও ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রুবেলকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রুবেল বর্তমানে কারাগারে রয়েছে বলে জানান আলফাজ।
পতাকানিউজ/কেএস

