১৫ দিনে কমান্ডিং অফিসারসহ তিন শতাধিক র্যাব সদস্যকে কক্সবাজার থেকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। র্যাবের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয়েছে র্যাব সদর দপ্তরে। একইসঙ্গে বদলি করা হয়েছে বিভিন্ন বাহিনী থেকে কর্মকর্তাদেরও। ইয়াবার কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। তবে এমন অভিযোগ শুধু এলিট ফোর্স র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে নয়, পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও রয়েছে। এসব ঘটনায় গুটি কয়েক ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন অনেকে।
তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে গত ১১ মাসে ৩ পুলিশ সদস্য মাদকসহ আটক হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ইয়াবা ও আইস বা ক্রিস্টাল মেথ পাওয়া যায়। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারসহ সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এতকিছুর পরও যেন থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক পাচার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার, সীমান্ত ঘেঁষা নিজ বাড়ি কিংবা কর্মস্থল হলেই মাদক কারবারে জড়ানোর প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। যে ৩ পুলিশ সদস্য মাদকসহ ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে কারো বাড়ি সেখানে ছিল, নয়তো পোস্টিংয়ের পর তারা জড়িয়েছে মাদক বাণিজ্যে। এসব ঘটনার মধ্যেও ফেন্সিডিল পাচারের অভিযোগে প্রত্যাহার হন লোহাগাড়া থানার এসআই কামাল হোসেন। হাতেনাতে ধরা পড়েন ছাত্র প্রতিনিধিদের হাতে। এর আগে আটক মাদককারবারিদের তথ্যে উঠে আসে ওই অভিযুক্ত এসআইয়ের নাম।
দীর্ঘদিন ধরে লোহাগাড়া থানার কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক উদ্ধারের নামে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সেই সূত্র ধরে অভিযানে নামে স্থানীয় ছাত্র প্রতিনিধিরা। এর প্রেক্ষিতে গত ২১ আগস্ট রাতে চুনতি বাজার এলাকায় টানা ৮ ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। এসময় একটি প্রাইভেট কার থেকে ৪৮ বোতল ফেনসিডিলসহ পুলিশের ৩ সোর্সকে আটক করেন তারা। তাদের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে এসআই কামালের নাম। আটক অভিযুক্তরা জানান, পার্বত্য লামা উপজেলার আজিজ নগরে পৌঁছে দিতে তাদের কন্ট্রাক্ট করেন এসআই কামাল। তিনি নিজেও ওই গাড়ির পেছনে অন্য গাড়িতে গার্ড দিয়ে সঙ্গে যাচ্ছিলেন।
এরপর এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ২২ আগস্ট এসআই কামাল হোসেনকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। এর আগে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলার ‘শ্রেষ্ঠ মাদক উদ্ধারকারী’ হিসেবে চট্টগ্রামের সাবেক জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতুর কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি।
এ ঘটনার ঠিক একদিন আগে ২০ আগস্ট ভোরে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই মুনিরুল ইসলামকে ১০ হাজার ইয়াবাসহ আটক করা হয়। এসব মাদক নিয়ে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের দিকে আসছিলেন। তাকে লোহাগাড়া থানা পুলিশ আটক করে এবং তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা করা হয়। তিনি কক্সবাজারের বালুখালী ইউনিয়নের ২নম্বর ওয়ার্ডের আকরাম উল্লাহর ছেলে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখার (সিটিএসবি) কোতোয়ালী জোনে কর্মরত ছিলেন এএসআই মুনিরুল ইসলাম। এ ঘটনার পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কক্সবাজারে বদলির ৩ মাসের মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার ইয়াবাসহ আটক হন রামু থানার এক পুলিশ সদস্য। গত ১৫ এপ্রিল কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে পুলিশ সদস্য জাহিদুল ইসলামকে (৩৩) আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ওই সময় তিনি রামু থানার ওয়ারলেস অপারেটর হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানার পাঙ্গাস গ্রামের আব্দুল ওয়াদুদ খানের ছেলে। তার স্ত্রীও একজন পুলিশ সদস্য। ওই মাদক উদ্ধারের ঘটনায় একটি প্রাইভেট কার জব্দসহ আরও দুজন সহযোগীকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় কক্সবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (এডি) সিরাজুল মোস্তফা বাদী হয়ে মামলা করেন। তাকেও এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সময় আটক হওয়া পুলিশ সদস্যের সহযোগীরা পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়নের কমল মুন্সিরহাটের বাবুল চৌধুরীর ছেলে অভিজিৎ চৌধুরী (৩৫) ও রাউজানের বাইন্যারহাট ডাবুয়ার নান্টু চৌধুরীর ছেলে পূষন চৌধুরী (৩৭)।
শুধু জেলা পুলিশ মাদক কারবারে জড়িয়েছেন এমন নয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদস্যরাও আরও আধুনিক মাদক নিয়ে ধরা পড়েছিলেন মহানগরীর মেহেদীবাগ এলাকায়। গত ২৫ জানুয়ারি রাতে সিএমপি জনসংযোগ শাখার এএসআই আলমগীর হোসেনসহ সহযোগী মেহেদী হাসানকে আটক করে র্যাব। এসময় এএসআইয়ের পকেট থেকে ১৬০ গ্রাম আইস বা ক্রিস্টাল মেথ পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় তার অপর এক সহযোগী মেহেদী হাসানও আটক হন। এই পুলিশ সদস্যর বাড়ি নোয়াখালী হলেও তিনি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। সেখানকার বাসিন্দা হিসেবে তিনি পুলিশে নিয়োগ পান। তাদের বিরুদ্ধে নগরীর চকবাজার থানায় মামলা হয়। ওই সময় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ পুলিশের এলিট ফোর্স হিসেবে পরিচিত র্যাব বিভিন্ন সময় মাদক উদ্ধারে সফলতা দেখিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় নানা প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। এবার তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে মাদক কারবারির অভিযোগ। র্যাব সদর দপ্তরের ৫টি পৃথক কোয়ার্টারে দেখা যায়, কর্মরত বাবুর্চি–সুইপার, সুবেদার, হাবিলদার, এসআই, নায়েক, কর্পোরাল, এএসআই, কনস্টেবল, সিপাহি, সৈনিকসহ বিভিন্ন পদের ৬৩৪ জনের বদলির আদেশ জারি হয়েছে। তিন শতাধিক র্যাব সদস্যকে প্রত্যাহার করে অন্যান্য ইউনিটে কর্মরতদের কক্সবাজার বদলি করা হয়েছে। তিন শতাধিক সদস্যকে কক্সবাজার থেকে অন্যান্য ইউনিটে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
র্যাব সদর দপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কামরুল হাসান কমান্ডার বিএন’র অনুমোদিত মেজর ফয়সাল আহমেদ (উপপরিচালক প্রশাসন) স্বাক্ষরিত গত ১৯ নভেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ জন সদস্যকে এবং একই তারিখে আরেক প্রজ্ঞাপনে ২০০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়। গত ১২ নভেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ৬২ জনকে বদলি করা হয়। ১৭ নভেম্বর মেজর ফয়সাল আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ১০০ জন সদস্যকে বিভিন্ন ইউনিটে বদলি করা হয়। এছাড়াও ২৭ নভেম্বর আরও ৭৪ জন র্যাব সদস্যকে বদলি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, কক্সবাজার ইউনিট থেকে বাবুর্চি–সুইপারসহ প্রায় সবাইকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। কথিত সিভিল টিমের কর্পোরাল ইমাম ও লুৎফর সরাসরি সিও–এর সঙ্গে কাজ করতো। তারা বড় বড় চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও কর্মকর্তা এহেতেশাম ও নাজমুলের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। কক্সবাজার ও র্যাব সদর দপ্তরে বিষয়টি বেশ আলোচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার) নাজমুস সাকিব খান পতাকানিউজকে বলেন, ‘মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো প্রবণতা যেন না থাকে সেজন্য সার্বক্ষণিক সকল পুলিশ সদস্যর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি। এছাড়া কোনো পুলিশ সদস্যকে মাদক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়া এ ধরণের কাজে তাদের কোনোভাবে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।’
মাদক সংশ্লিষ্টতা থেকে উত্তরণের উপায় কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সমাজ ঠিক হতে হবে। তবেই এটি পরিবর্তন হবে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ পরিবার থেকে শুরু করে পাড়া মহল্লা, গ্রাম, শহর তথা সারা দেশকে ধাপে ধাপে উন্নয়ন করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, গত বছর ৩৫ হাজার পিস ইয়াবার একটি বড় চালান নিয়ে ঢাকার পুলিশ আটক হয়েছিলেন কক্সবাজারে। তিনি দীর্ঘদিন কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে এপিবিএন সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে ঢাকা বদলি হলেও ছাড়তে পারেননি ‘কাঁচা’ টাকা ইনকামের নেশা। ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়ে মাদককারবারি করতে গিয়ে ধরা পড়েন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযানে।
এছাড়া গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে সদর উপজেলার ঝিলংজায় ঢাকা জজ কোর্টের কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলম (৫০) আটক হন। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার মোগলটুরলা এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে। সিএনজি অটোরিকশা করে মাদক পাচারের সময় ওই গাড়ির চালক উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের উত্তর পুকুরিয়ার মৃত আমির হোসেনের ছেলে শামসুল আলমকেও (৩২) আটক করা হয়। এ ঘটনায় ডিএনসি কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সিরাজুল মোস্তফা বাদী হয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
শুধু চট্টগ্রাম কিংবা কক্সবাজার রুটে নয়, অন্য জেলার পুলিশও যুক্ত রয়েছে মাদক বাণিজ্যে। চলতি বছরের ২৫ জুন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী বাজারের হকার্স মার্কেট থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক হন এক পুলিশ সদস্য। তিনি বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল মো. মোস্তফা খালেদ (৩০)। জেলা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি) আটক করার পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ঘটনায় তিনিও সাময়িক বরখাস্ত হন। চট্টগ্রাম জেলার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে তিনি।
পতাকানিউজ/আরবি

