চট্টগ্রামের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ, দীর্ঘদিন ধরে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাহীন দুর্ভোগে ভুগছিল এখানকার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। সম্প্রতি সেই দুর্ভোগে আশার আলো হয়ে এসেছে ফেরি সার্ভিস। প্রত্যাশা ছিল ফেরির মাধ্যমে উন্নয়ন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র।
অভিযোগ, ফেরিঘাট ও এর আশপাশের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগ সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপি ও পৌর বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে। একচেটিয়া বালির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে নাম ব্যবহার করেন বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী এক প্রভাবশালী নেতার।
চলতি বর্ষা মৌসুমে ফেরী থেকে তীরে নামার পথ সুগম করতে জরুরি দরপত্র আহবান করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যেখানে দেওয়া হবে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ। বরাদ্দের আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ হয় প্রায় ৮ কোটি টাকা। যার বরাদ্দ প্রক্রিয়া হয় অনলাইনে।

দরপত্রের পর বিপত্তি
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এই বরাদ্দে সব থেকে কম খরচে কাজ করার দরপত্র দেয় প্রাণ কোম্পানির সিস্টার কনসার্ন প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। কিন্তু তারা কাজ শুরু করতে গেলেই বাধে বিপত্তি। সেখানে নিজ দায়িত্বে বালি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে স্থানীয় বিএনিপর দুই নেতা। তারা হলেন, সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনির তালুকদার ও পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাইন উদ্দিন।
প্রকল্পের কাজের জন্য বালি নিয়ে যায় প্রপার্টি লিমিটেডের পক্ষে কাজ পাওয়া লোক। তিনি সেখানে গেলে তাকে বালি আনলোড করতে বাধা দেয় মনির ও মাইন উদ্দিন। এ সময় তারা ওই লোককে হুমকি দেয়। এমন একটা অডিও ক্লিপ পতাকা নিউজের হাতে এসেছে। ওই অডিও ক্লিপে শোনা যায়, কয়েকজন ব্যক্তির কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ এক ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। শুরু করেন অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল।
‘বালিও খামু বস্তাও খামু’
তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বালিও খামু বস্তাও খামু, বেচিফালামু… তুই কেরে ঢাকা বসি এখানে বালি ফালাবি? আর কোনো বালি আপনি দিতে পারবেন না।’ এসময় ঠিকাদার পক্ষের একজনকে বলতে শোনা যায় আমি এখন যে বালি এনেছি তা রেখে যায়। এসময় আরও উত্তেজিত হয়ে ওই দুই নেতা বলেন, ‘যা আনসেন তা ফেরত নিয়ে যান। একটি বালিও নামাতে পারবেন না।’

স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী নিশ্চিত করেন, অডিওতে শোনা যাওয়া কণ্ঠগুলো মনির তালুকদার ও মাইন উদ্দিনের। তারাও অবশ্য এটি তাদের কণ্ঠ বলে পতাকানিউজের কাছে স্বীকার করেছেন।
সরকার পতনের পর (৫ আগস্ট, ২০২৪) থেকে এ দুই নেতা সন্দ্বীপে নিজেদের ‘প্রতিবাদী অবস্থান’ তুলে ধরার আড়ালে প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক ফায়দা লুটে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপিরই একাধিক নেতা।
তারা জানান, পৌরসভার বাবর মেম্বার নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার জমি থেকে মাটি ও বালি কেটে বিক্রি করেছেন মনির ও মাইন। এমনকি গুপ্তছড়া ফেরিঘাট এলাকায় ড্রেজিং করে জমা হওয়া বালিও দিনে দুপুরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। গুপ্তছড়া ফেরিঘাটে সম্প্রতি শুরু হওয়া নতুন সড়ক নির্মাণেও অভিযোগের তীর তাঁদের দিকে। অভিযোগ, এই প্রকল্পে নিম্নমানের ইট সরবরাহ করে আর্থিক লাভ করছেন তারা। অথচ কাজটি স্থানীয় জনস্বার্থের জন্য হওয়া কথা ছিল।
‘তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর’?
মনির ও মাইন উদ্দিন নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান মিল্টন ভূঁইয়ার নাম ভাঙিয়ে- এমন অভিযোগও উঠেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তারা অভিযোগগুলো স্বীকার করেন বটে, তবে দাবি করেন, ‘তারা সন্দ্বীপে চলমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।’

সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির যুগ্ন আহবাহয়ক মনির তালুকদার বলেন, ‘আমাকে আরএফএল কোম্পানি বলেছে বালি আমার থেকে নিবে। পরে দেখি বালি দিচ্ছে অন্য কেউ। তাই আমি জানতে গিয়েছি কেন আমার থেকে নেওয়া হয়নি।’
ঘাটের পাশে জমে থাকা ড্রেজিং এর বালি ও পৌরসভার আওয়ামী নেতার মাটি-বালি বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব আমি করিনি। মগধরা ইউনিয়নের মোশাররফ নামে একজন করেছে। সে নাকি জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি আনসে।’
কে এই মোশাররফ
সেখানে অপর আরেকটি কন্ঠ সন্দ্বীপ পৌরসভা বিএনপির যুগ্ন আহবায়ক মাইন উদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘আমি মনির ভাইর সাথে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করি। কথাবার্তায় একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়েছি। তবে জোর করিনি।’
কিন্তু সেই অডিও রেকর্ডে শোনা যায় বাল্কহেডে করে আনা বালি তারা ঘাটে নামাতে স্পষ্ট বারণ করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের আগের মাল ছিলো তাই নামাতে বারণ করা হয়।’
কথোপকথনে তিনিও এ কাজে মোশাররফ জড়িত বলে দাবি করেন। মাইন উদ্দিন বলেন, মোশাররফ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহচর বলে এলাকায় প্রচার করে। তবে দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে গুপ্তছড়া ঘাট দখল কেন্দ্রীক সংঘর্ষের পর মোশাররফকে ইউনিয়ন বিএনপি থেকে বহিস্কার করা হয়।
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট আবু তাহেরের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমি অডিও রেকর্ড শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পতাকানিউজ/এএস/কেএস

