সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে পরিচিত লোকজনের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়, কুশল বিনিময় হয়। এরকম একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে একবার পড়ে যাই এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। অনেক লোকের ভিড়ে অপরিচিত এক ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এসে হঠাৎ পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বসলেন। ভদ্রলোক আমার কাছাকাছি বয়সী হতে পারে। সাথে আছেন তার স্ত্রী ও দু’সন্তান। বড়টি মেয়ে, ছোটটি ছেলে। ভদ্রলোক স্ত্রী ও সন্তানদের নির্দেশ দিলেন আমাকে প্রণাম করতে। ভ্যাবাচাকা খাওয়া আমি বাধা দিতে চেয়েও কোনো লাভ হয়নি। ভদ্রলোক স্ত্রীকে বলছিলেন, ‘এই সেই দাদা যার কারণে তুমি লগ্নভ্রষ্টা হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলে, কারফিউর মধ্যেও আমি লগ্নের আগে বিয়ে মণ্ডপে পৌঁছাতে পেরেছিলাম।’
এবার চিনতে পারি ভদ্রলোককে। মনে পড়ে ঘটনাটি প্রায় পনের বছর আগের। তখন জেনারেল এরশাদের শাসনামল। ১৯৮২ সালে সেনাবাহিনী প্রধান লে. জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। বিনা রক্তপাতে ক্যু। ছাত্র জনতা এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আন্দোলনে নামে। এরশাদও নানা প্রলোভনে বিরোধী নেতাদের হাত করে নিজের দলে ভিড়াতে থাকেন। শেষের দিকে ১৯৮৯-৯০ সময়ে পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থায় চলে আসে। বিরোধীদলীয় তিনটি জোটের আহবানে দেশে ২৪, ৪৮, ৭২ ঘণ্টার লাগাতার হরতাল অবরোধের কর্মসুচি পালিত হচ্ছিল। বিরোধী দলের আন্দোলন দমাতে তখন মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনি, পুলিশ, বিডিআরসহ সব সংস্থাকে। দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার চালিয়েও যখন কাজ হচ্ছিলা না তখন শেষ অস্ত্র হিসেবে জারি করা হতে থাকে কারফিউ বা সান্ধ্য আইন। সান্ধ্য আইন হলেও কখনো বিকেল থেকেই এই কারফিউ জারি করা হত। টানা হরতাল অবরোধের পাশাপাশি কারফিউর কারণে জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু জীবনতো থেমে থাকে না। জীবিকার তাগিদ ছাড়াও বিয়ে-শাদী, স্বজনের মৃত্যু বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে ঘরের বাইরে আসতে হয়। কড়া কারফিউর মধ্যে তা অসাধ্য হয়ে পড়ে। কেননা কারফিউ চলাকালীন সময়ে রাস্তায় কাউকে দেখলেই গুলি করার নির্দেশ রয়েছে।
১৯৮৯ সালের শেষের দিকে হবে। তখন পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। যে কোনো সময় আসছে কারফিউর ঘোষণা। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে অনেকে সামাজিক অনুষ্ঠানাদি সারার চেষ্টা করেন। তখন কাজ করি দৈনিক নয়াবাংলায়। একদিন রাতে কাজে ব্যস্ত। সেদিন পত্রিকার একমাত্র রিপোর্টার আমি। রাউন্ড আপের দায়িত্বও আমার। দিনটি ছিল শুক্রবার, সেই বন্ধের দিনেও সন্ধ্যা থেকেই কারফিউ চলছে। রাতে এক ভদ্রলোক ফাঁকফোঁকর গলিয়ে অফিসে এসে হাজির। খুবই বিপদে পড়েছেন, একটু সহায়তা চান।
জেএম সেন হলে ওর ভাগ্নীর বিয়ে। নৌপথে কর্ণফুলী নদী হয়ে বর এসেছেন গ্রাম থেকে। কিন্তু কারফিউর কারণে নদী থেকে আর তীরে উঠে বিয়ের মণ্ডপে আসা হচ্ছে না কঠোর নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করে। এদিকে লগ্নের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। বর আসতে না পারলে সব আয়োজন পণ্ড হয়ে যাবে। কনে হবে লগ্নভ্রষ্টা। সবশুনে তাঁকে সহায়তার চেষ্টা করলাম। তখন নিয়মিত রাউন্ড আপ করার কারণে থানার ওসি এবং ডিউটি অফিসার সকলের কাছেই নামে পরিচিত। সিএমপিতে তখন ছয়টি থানা। কোতোয়ালীর ওসি তখন নাজমুল আলম, অধিকাংশ থানার ওসিদের মত তিনিও ছিলেন বিশাল দেহের অধিকারী। ফোন করলাম তাঁকে। ভাগ্য ভাল রুমে ছিলেন, পেয়ে গেলাম সহজে। বিষয়টা বললাম। তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। পরিচয় দিলেন বিশাল মনেরও। যে ভদ্রলোক আমার অফিসে এসেছেন তাঁকে পুলিশের একটি গাড়ি এসে নিয়ে গেলেন ফিরিঙ্গি বাজার ঘাটে। বরসহ বরযাত্রীরা পুলিশের সহায়তায় লগ্নের আগেই বিয়ে মণ্ডপে পৌঁছালে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ উৎকন্ঠার অবসান ঘটে।
যিনি বর তিনি পরে একদিন এসে দেখা করেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যান। অসংখ্য ঘটনার মধ্যে ছোট্ট এই ঘটনাটি মনে থাকার কথা নয়, ছিলও না। শুরুতেই যে লোকের কথা বলেছিলাম ইনিই সেই লোকের ভাগ্নী জামাই। পরে মামা শ্বশুরের কাছে শুনেছেন বিয়ের দিন কিভাবে বিয়ে মণ্ডপে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। সেদিনের সামান্য সহযোগিতার কথা মনে রেখেছেন এবং বহু বছর পর আমাকে দেখে চিনতে পেরে স্ত্রী-সন্তানসহ প্রণাম করে কৃতজ্ঞতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কারফিউর কারণে এ রকম অনেক সামাজিক অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে। অনেকে প্রিয় স্বজনের মৃত্যুতে শেষ বিদায় জানাতে পারেন নি। ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওটার কথা নাই বা বললাম।
এরশাদ শাসনামলে সংবাদপত্রে ‘প্রেস অ্যাডভাইজ’ আসত রাতের বেলায়। তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) জানাত কোন খবরটি প্রকাশ করা যাবে না বা কতটুকু যাবে। নির্দেশ ছিল ‘হরতাল’ ‘অবরোধ’ এসব শব্দ সংবাদপত্রে উল্লেখ করা যাবে না। সেজন্য বিকল্প হিসেবে সংবাদমাধ্যম বেছে নেয় ‘কর্মসূচি’ শব্দটি। পাঠকও এতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েন।
মনে পড়ে বিরোধী দলের কোনো কর্মসূচি থাকে না এমন দিন দেখে কোনো এক শুক্রবারে এ রকম একটি বিয়ের আয়োজন হয় নগরীর অভিজাত একটি কমিউনিটি সেন্টারে। সেদিন নগরীতে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী কনভয়ের উপর ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিকেল থেকেই জারি করা হয় ‘সান্ধ্য আইন’ কারফিউ। ফলে বড় বাজেটের এই বিয়ের অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। মাটন কাচ্চি বিরিয়ানি, চিকেন রোস্টসহ প্রায় দুই হাজার মানুষের ভোজের ব্যবস্থা সম্পন্ন হলেও এই খাবার নিয়েই আয়োজকদের পড়তে হয় বিপাকে। কারফিউ না থাকলে বর-কনে এবং তাদের আত্মীয় স্বজনের বাসা, এতিমখানায় প্রেরণ করা যেত। তারও সুযোগ ছিল না বলে প্রচুর খাবার নষ্ট হয়েছে। থানা এবং পত্রিকা অফিসেও অনেক সময় খাবার আসত এ রকম পরিস্থিতিতে।
পত্রিকা অফিসে এখন যেভাবে রিপোর্টারদের পাঁচটা ছয়টার মধ্যে কাজ শেষ করতে হয় তখন তা ছিল না। আমরা রিপোর্টাররা অফিসে ঢুকতাম রাত আটটার পরে। ডেস্কের লোকজন কেউ সে সময়ে কেউ আরও পরে আসতেন। ট্রেসিং, পেস্টিং, মেকআপ ইত্যাদির ব্যাপার ছিল। সব শেষ করে পত্রিকা প্রেসে যেতে যেতে ভোর তিনটা চারটা বেজে যেত। অনেক সময় ডেস্কের আড্ডায় মশগুল হয়ে একসাথে সবাই বের হতাম। অনেক সময় রাত দুটা আড়াইটায় বের হয়ে হেঁটে বাসার পথ ধরতাম। কারফিউর কারণে রাস্তাঘাটে সুনসান নীরবতা। কুত্তা আর সাংবাদিক ছাড়া আর কারো দেখা মেলে না। কেউ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
তারপরও নগরজীবনে কত জরুরি কাজ পড়ে যায়। বাসাবাড়ির কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেয়া, জরুরি ওষুধ কেনার প্রয়োজন বা অন্য কোনো বিপদ আপদে রাস্তায় বের হয়ে নতুন করে বিপদে পড়েছেন এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছিল। পুলিশকে গ্রেপ্তারের টার্গেট দেয়া হত। কারফিউর সময়ে রাস্তায় কাউকে পেলে তাকে পুলিশ ভ্যানে তুলে সারারাত ঘোরানো হত। এরমধ্যে যাদের পরিবার খবর পেয়ে যোগাযোগ করে ‘ম্যানেজ’ করতে পারত তারা ছাড়া অন্যদের পাঠানো হত কারাগারে। তখন ল্যান্ডফোন সবার বাড়িতে ছিল না। একটি ভবনে যে দু একটি বাসায় ফোন থাকত তা আপদে বিপদে পুরো বিল্ডিং ও আশেপাশের প্রতিবেশীরা ব্যবহার করত অনুমতিসাপেক্ষে। অনেক সময় বাইরে থেকে প্রতিবেশীর ফোন আসলে তাদের ডেকে দিতে হত। এ রকম অবস্থায় যাদের ফোন ব্যবহারের কোনো সু্যোগ ছিল না তারা জানাতেও পারত না তাদের অবস্থান। রাস্তায় বের হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া অনেকের খোঁজও মিলত না।
‘গণগ্রেপ্তার’ এর সুযোগে ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ চলছে এমন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হত। এরকম লোকজনের স্বজনরা সরকারি দলের নেতা পাতিনেতাদের দ্বারস্থ হতেন বা শেষ ভরসা হিসেবে পত্রিকা অফিসে হাজির হয়ে সাহায্য চাইতেন।
মনে পড়ে, থানায় মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা জানিয়ে উপরমহলে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়ার পর তা আর কমানোর সুযোগ থাকে না। অনুরোধ পেয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতে রাস্তা থেকে নিরীহ আরেকজনকে ধরে এনে হাজতে ঢুকিয়ে দিতো, যার জন্য সুপারিশ ছিল তাকে ছাড়া হয়েছে -এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটেছে।
এরমধ্যেও নগরীর অলিগলি থেকে হঠাৎ করে কোনো গ্রুপ বের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা এলাকায় বোমা ককটেল ফাটিয়ে আবার উধাও হয়ে যেত। এসবের কারণে তটস্থ থাকতে হত পুলিশ, বিডিআরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কোন ঘটনা ঘটার পর পুলিশের দৌঁড়ানি ও ধাওয়ার মধ্যেখানে কতবার যে পড়তে হয়েছে। ওরা চিনতে পারত কিনা বা কিভাবে আন্দাজ করত সাংবাদিক তা জানি না। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিত। কারফিউকালে কোন সাংবাদিক তখন নাজেহালের শিকার হননি।
কারফিউ কোন কোন আমলে
এই যাপিত জীবনে বেশ ক’বার সামরিক শাসন এবং কারফিউ দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার যখন জন্ম হয় তার কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জাকে হঠিয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল আয়ুব খান। ক্ষমতা নিয়েই তিনি সামরিক শাসন জারি করেন। সামরিক শাসনের কঠোরতার গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়ে সেই আয়ুব খানের বিরুদ্ধে উনসত্তরে যে গণঅভ্যূত্থান সংঘটিত হয় তা প্রত্যক্ষ করা এবং ছাত্র মিছিলে অংশগ্রহণের সুযোগও আসে। সে সময় আমি স্কুল শিক্ষার্থী, নবম শ্রেণীতে পড়তাম। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতনের পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করে জারি করেন সামরিক শাসন। তারপরের ইতিহাস শুধুই নৃশংসতা ও বর্বরতার। বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের লড়াই তখন রূপ নেয় স্বাধীনতার সংগ্রামে। যার অনিবার্য পরিণতি মহান মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এবং পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব শহর কারফিউর আওতায় চলে যায়। রাস্তায় কাউকে দেখলেই গুলি করে লাশ নদীতে বা ডোবায় ফেলে দেয়া হত। দিনের বেলায়ও প্রায়সময় কারফিউ জারি করা হত। সেসব দৃশ্য ছিল ভয়াবহ নৃশংস। সেটার পরিসর অনেক বড়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান এবং ভারত নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের দূরত্ব হাজার মাইলেও বেশি। ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টিসহ সবকিছুই ভিন্ন। পাকিস্তানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তাদের শোষণ শাসনে নিগৃহীত পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৮ সাল থেকেই বাঙালি শোষন বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। তারা আমাদের ভাষার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়ার চেষ্টা চালায়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চাইলে ১৯৫২ সালে বাঙালি ক্ষাভে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উত্তাল ঢাকায় বিক্ষোভ দমনে জারি করা হয় কারফিউ। সেই কারফিউ কিভাবে ছাত্র জনতা ভেঙেছিল সেটিও দীর্ঘ ইতিহাস।
স্বাধীন বাংলাদেশেও খোন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও এই কারফিউ প্রত্যক্ষ করেছেন জনগণ। সামরিক শাসনের অধীনে কারফিউ খুবই কড়াকড়িভাবে পালিত হত। আর্মির লোকজন লম্বা চুল দেখলে, শার্টের আস্তিন গুটানো দেখলে রাস্তাঘাটে জনসম্মুখে অপদস্ত করত বলে মানুষ ভয়ে আতংকে থাকত। সেলুনে ভিড় লেগে থাকতেও দেখা গেছে চুল ছোট করতে। নালানর্দমার ময়লা আবর্জনা, পুকুর-ডোবার কচুরিপানা সব রাতারাতি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর্মির ভয়ে এলাকার লোকজন, পুকুর ডোবার মালিকরা তা পরিচ্ছন্ন রেখেছেন।
রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও বাংলাদেশের মানুষ কারফিউ দেখেছে করোনা অতিমারির সময়ে। তখন দেশে অনির্দিষ্টকালের লকডাউন চলাকালে যখন করোনার প্রকোপ হু হু করে বেড়ে যাচ্ছিল তখন মানুষকে ঘরে আবদ্ধ রাখতে এই কারফিউ দেয়া হয়েছিল। অলিগলিতে দেখেছি মানুষ করোনার বিধিনিষেধ না মেনে কিভাবে রাস্তায় বের হত। পুলিশের গাড়ি আসার সাইরেন শুনলে অলিগলির দোকানপাট ঝাঁপ ফেলার একটা ছন্দবদ্ধ আওয়াজ উঠত। ‘আসছে, আসছে’ বলে শোর শুনে আড্ডাবাজ লোকগুলো দৌঁড়ে আড়ালে চলে যেত। পুলিশের গাড়ি চলে গেলে আস্তে আস্তে সবাই ফাঁকফোকর থেকে বের হয়ে আসত।
এই দৃশ্য দেখে মনে পড়ে যেত মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথা। গ্রামগঞ্জ, লোকালয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি ঢুকে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি মহিলাদের উপর ধর্ষনসহ শারিরিক নিপীড়ন চালাত। পাক সেনারা গ্রামে বা কোন মহল্লার দিকে গেলে তখন ‘আসছে, আসছে’ বলে শোর উঠলে মানুষজন বিশেষকরে যুবক কিশোররা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেত। বাড়ির মহিলা বা মেয়েদেরও লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হত।
সর্বশেষ দেশবাসী কারফিউ প্রত্যক্ষ করল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়। শেখ হাসিনা আন্দোলন দমাতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্নস্থানে দিনে ও রাতে কারফিউ জারি করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। কিন্তু জনতার উত্তাল স্রোতে সেই কারফিউ কার্যকারিতা হারালেও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন পর্যন্ত শত শত মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যা ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

